সিংগাপুর ভ্রমণ (কিছু বিস্ময় ,কিছু দেশ দুঃশ্চিন্তা)

সিংগাপুর ভ্রমণ (কিছু বিস্ময় ,কিছু দেশ দুঃশ্চিন্তা)

রাবেয়া রব্বানি: (কিছুদিন আগে কক্সবাজার ভ্রমণ নিয়ে একটা পোষ্ট দিয়েছিলাম পোষ্টটি ছোট হওয়ায় কিছু প্রিয় শৈলাররা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বিধায় এবার একটা দীর্ঘ গপানোর মুডে আছি।ভ্রমণ কাহিনী ছাপিয়ে ভাবনার নানা ডালা পালার বিস্তারকে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন আশা করি।
এবারের কাহীনি সিঙ্গাপুরকে নিয়ে।কয়েকটা পর্ব থাকবে।এটা ভুমিকা পোষ্ট তাই ভুমিকাই করা হবে হয়ত।:D.)

যাত্রা শুরুঃ-
ভ্রমণটা ছিল এই রোজার ঈদের দু দিন আগে।মানে আটাশে অগাষ্ট রাতে।আগে আমাদের ফ্লাইট ছিল রাত বারোটার।প্রথম বিদেশ ভ্রমণ হিসেবে বেশ কিছুটা উত্তেজনা তো ছিলই।পাশাপাশি ঢাকা শহরের ভবিতব্য জ্যামের কথা ভেবে আমরা সারে ন’টায় মোহাম্মদপুর থেকে রওনা দেই।আমরা বলতে আমি আমার কন্যা আর তার পিতা।যথাসময়েই আমরা বিমান বন্দরের কাছাকাছি চলে যাই।কিন্তু বিমানবন্দরের নাম দেখে আমার চক্ষু চরকগাছ।জিয়া বিমানবন্দর কবে শাহজালাল বিমানবন্দর হল?মাথায় প্রশ্ন এলো তাহলে সিলেট বিমানবন্দরের নাম কি?প্রশ্নের কোন জবাব আমার মস্তিস্ক থেকে বের হলো না।কারন আমি খবর দেখি না পেপার পড়ি না।ফেসবুক বা ব্লগে কোন এই জাতীয় সচেতনামূলক কোন পোষ্ট করি না।এর কারন হলো,
{আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিক দু ধরনের
(এক)এরা পেপারের প্রতিটা খবর খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ে ,কোন চ্যানেলের কোন নিউজ বাদ দেয় না।ঘড়ি ধরে দেখে।রেগুলার আড্ডায় ঝড় তুলে দেশের কথা বলে।ফেসবুক গরম করে ফেলে।কিন্তু দেশের জন্য কিছু করে না।তারাও নিজের ও নিজের সন্তানের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে।তাদের কেউ কিভাবে একটি মাথা গোজার ঠাই কিংবা চারতলা বাড়ি বা একটি ফ্লাট করে তা থেকে শান্তিমূলক উপার্জনের ব্যবস্থা করা যায় তা ভাবে ,কেউ কিভাবে বিদেশে পারি দেয়া যায় তা ভাবে, কিংবা কিভাবে একটি ভালো ডিগ্রী অর্জন করা যায় তা ভাবে।এরা রাজনৈতিক নেতাদের গালি দিয়ে আরাম খোজে ,পাকিস্তানিদের ঘৃনার অস্ত্র দিয়ে মাসাকার করে ফেলে,হিন্দী আর উর্দু ভাষার কাথা পোড়ে।ব্যাস।দেশ বা মানুষ তাদের চিন্তায় কতটা আছে তাই চিন্তার বিষয়।
(দুই)
এরাও কিছু করেন না করতে পারেন না।সংবাদ দেখলে আর পেপার পড়লে এদের রাতে দুঃস্বপ্ন তাড়া করে ফেরে।কিছু করতে না পারার ব্যার্থতা যাদের কুড়ে কুড়ে খায়।তাই তারা চোখ বুজে থাকে।তারা বর্তমান অর্থমন্ত্রীর নামও ঠিক মত বলতে পারেন না।তাদের কানে হাত চাপা দেয়া।দেশ বা মানুষ তাদের কাছেও শুণ্য প্রতিদান পায়।}
আমি দ্বিতীয় দলের।
কবে কখন এই পরিবর্তন হলো আমার জানা নেই।এটা জানি পাঁচ বছর পর পর নাম বদলের পালায় এই দেশের উপার্জন থেকে বেশ কিছু অর্থ আর ক্ষমতা ব্যয় হয়।তবে জিয়া বিমানবন্দরের নাম বদল দেখে একটু অবাক ই হলাম।তবে বাইরে বেরুলে যে চোখে আলো পড়বেই তা ভেবে দেখিনি।এ ব্যাপারে পরে কথা বলব।
এরপর যথারীতি সিকিউরিটি পার করে প্রথম ওয়েটিং রুম এ বসলাম।সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের গেট তখনো ওপেন হয়নি।আমার স্বামী আর বাচ্চা মলগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।আমি বসেই ছিলাম।তখন এক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম আমার দিকে তাকিয়ে আছে।এও বুঝলাম উনি আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী।আমি সম্মতিসূচক চাওনি দেয়াতে তিনি তার হুইল চেয়ার নিয়ে একটু কাছে এলেন।আহারে মহিলা পঙ্গু!প্রথম দর্শনেই ভদ্রমহিলার প্রতি একটা সহানুভুতি জন্মালো।বয়স তেমন বেশি না। উনি আমার ব্যাপারে এটা ওটা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন।আমিও জিজ্ঞেস করলাম আপনি কোথায় যাচ্ছেন।
তিনি বললেন,অস্ট্রেলিয়া।
আমি বললাম,কার কাছে?
বললেন,আমার মেয়ের জমজ বাচ্চা হয়েছে।আমি তাদের কাছে যাচ্ছি।
ভদ্রমহিলার চেহারার খুশি দেখে আমার ও ভালো লাগল।উনি হয়ত খুব কৌতুহলী আমাকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন।আমি একটা প্রশ্ন করব করব করে করেই ফেললাম।আপনার পায়ের সমস্যাটা কি?
উনি শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলেন।বললেন,
লাগেজ টানতে খারাপ লাগে, কষ্ট হয় ।একা একা তাই হুইল চেয়ার একটা প্রহসন।
আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা খুব ভালো না হলেও খারাপ না।ওনাকে খুব সরল চেহারার একজন পঙ্গুই মনে হয়েছিল।আমি দ্বিতীয় ধাক্কা খেলাম।তারপর উনি এও বললেন উনি বেশ সুস্থ।আমার মায়ের বয়সী একজন মহিলার উপর শ্রদ্ধাটা চট করেই অনেকটা কমে গেল।আমি উনার সাথে কথা বলতে আর আগ্রহী থাকলাম না।ওদিকে আমরা প্যাসেঞ্জার এলার্ট পেয়ে বিদায় জানিয়ে লাগেজ ক্যারিয়ার নিয়ে হাটতে লাগলাম।পেছনে তাকিয়ে দেখলাম পেছনে মহিলা হুইল চেয়ারে বসে আছেন।একজন লোক হয়ত এয়ারপোর্টের সার্ভিসিং এর, তার লাগেজ ক্যারীয়ার ঠেলছে।উনি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে লোকটাকে দেখালেন।যেন বোঝালেন,দেখ কি বোকার হদ্দ এরা।
এর পর আবার চেকিং ।তবে শুনেছিলাম সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জারদের অতিমাত্রায় চেকিং বা হয়রানী কম করে।দেখলাম তা ঠিক। ওখানে ঢুকার সময় দেখলাম,১৭-১৮ থেকে বিশ বাইশ বছর বয়সী ছেলেদের একটা বড় গ্রুপ।এদের চেহারায় স্বল্পজীবি ছাপ এবং এ্কজনের মালামাল প্রায় ব্যাগ উলটে দেখছে।উপরে দেয়া ব্যাগ হতে কিছু বিস্কুট আর চানাচুরের প্যাকেট বেরুলো।ছেলেটা সেদিকে আহত চোখে তাকিয়ে আছে।আমরা চেকিং সেকশান পার করে ওয়েটিং রুম এ ঢুকলাম।জানতে পারলাম বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর সরকার বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে তাদের রেগুলার কন্সট্রাকশনের জন্য এই বয়সী ছেলে নিয়ে থাকে।খুব অল্প বেতন মাইনে হয় এদের।গরীব দেশের গরীব সন্তানেরা নিরুপায় তাদের অভাবের কাছে।অন্যের দেশের কি উন্নয়নে এই সস্তা শ্রম যে কতটুকু বড় ভুমিকায় আছে তা হয়ত এই ছেলেগুলো নিজেরাও জানে না।
রাত প্রায় সারে এগারোটা বাজলেও আমার মেয়ের চোখে ঘুমের কোন চিহ্ন নেই।আমরা অবশেষে প্লেনে উঠে টেক অফের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।ইন্টারন্যাশনালে ফ্লাইটে এই প্রথম প্লেনের ভেতরের ব্যবস্থা দেখে মোটামুটি মুগ্ধ।দ্বিতীয় বার বলেই হয়ত প্লেন উপরে ঊঠতে থাকলে কানে প্রচন্ড ব্যাথা আর অসস্তি অনুভব করি।মনে হচ্ছিল আমি আর কখনো কানে শুনতে পাবোনা।আমার প্রচন্ড হাইট ফোবিয়া।যে আমি কখনো রেল্লিং ছাড়া ছাদে উঠিনা।আর এই আমিতো ভয় পাবোই হাল্কা ভয়টা মেনে নিলাম।এর উপর আবহাওয়া ভালো ছিল না।হঠাৎ হঠাৎ সাবধান করে দিচ্ছিল প্লেন কর্তৃপক্ষ আর একটু পর পরই মনে হচ্ছিল বজ্রপাতের বুক চিরে প্লেনটা যাচ্ছে।কেপে উঠছিল প্লেন আর যাত্রীরা।আমি ভয় পেলেওআমার মেয়ে তাতে আরো বেশি উতসাহিত হয়ে উঠল দুষ্টুমিতে।তার এমনিতেই ঘন ঘন কাল্পনিক কল আসে আর পকেট থেকে একটা কাল্পনিক মোবাইলে সে ব্যস্ত কথা বলে।প্লেনে ঊঠে তা বেড়ে গেল।তার বায়না সে এখন ফ্লোরে হাটবে।বসে থাকবে না।ছোট বাচ্চা নিয়ে জার্নির মজাটা বুঝলাম।তাও রক্ষে ডিনারের পর সে ঘুমিয়ে গেল।আনুমানিক রাত দু’টায়।কি করব বুঝতে পারছিলাম না।সামনের ডিসপ্লে টিভিটা অন করলাম।মুভি খুজতে লাগলাম।বাঙ্গালা কোন অপশন নাই।জানা ভাষার মধ্যে ইংরেজী আর হিন্দি।সব দেখে সঞ্জয় লীলা বানশালীর গুজারিশ দেখবো বলে ঠিক করলাম।উচু মাত্রার সাহিত্য নিয়ে উনি কাজ করেন।যেমন,শরৎ চন্দ্রের দেবদাস মৈত্রিয়ী দেবীর ন হন্যতে তাই তার পরিচালিত ছবি দেখতে আগ্রহী হলাম।আমি আমার ভ্রমণ কাহীনিতে কেন একটি মুভির কথা বলছি তা মুভিটি দেখলেই বুঝবেন।যেকোন লেখক কবি বিশেষ করে গল্পকার এমন একটা গল্প পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকে বা থাকবে।
প্লেনের যাত্রীরা কেউ কেউ ঘুমিয়ে, কেউ কেউ যার যার ডিসপ্লে টিভিতে মনোযোগী ,আমার কন্যা আর তার পিতাও ঘুমন্ত।আমি এয়ারফোন কানে দিয়ে ঢুকে গেলাম মিঃ ইভান মাসকেরানাস এর জগৎ এ।খুব সংক্ষেপে কাহীনিটি বলার লোভ সামলাতে পারছি না।
ইভান যিনি যুবক বয়সেই একজন জগৎবিখ্যাত যাদুকর ছিলেন।তার নামই মানুষের মুখে বিস্ময় ছিল।একদিন তার একটি শোতে তার ই বন্ধু কর্তৃক ষড়যন্ত্রে সে প্রচন্ড ভাবে আহত হয়।বেচে সে উঠে ঠিক ই কিন্তু তার মুখ মাথা আর মস্তিস্ক বাদে সবই অবশ হয়ে যায়। সেরে উঠে ইভান তবু হাসতে জানে।শুধু বেচে থাকাটাই যে কতটা সুখের তা বোঝাতে চায় মানুষকে।সে তার মত মানুষদের জন্য একটি বই লিখে লার্নিং টু ফ্লাই।বইটি প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পায়।রেডিও জিন্দেগী নামে একটা রেডিও প্রোগ্রাম ও সে চালায়।যেখানে বেচে থাকতে অনিচ্ছুক লোক।বিষন্ন লোকদের জন্য প্রেরনার উৎস হিসাবে থাকে।ধীরে ধীরে সেই নামকরা যাদুকর ইন্ডিয়াতে জীবনের একটা প্রতিকে পরিণত হয়।ইভানই যেন জানে বেচে থাকা কত সুখের।এভাবে চৌদ্দ বছর পার হয়।ইভান তার অবশ শরীরে ছটফটানো আত্মা নিয়ে বেচে থাকার আর কোন জীবনিশক্তি খুজে পায় না।সে তার এক উকিল বন্ধুকে নিয়ে আদালতে একটি পিটিশন জাড়ি করে।নাম ইউথেনেশিয়া।মানে ইচ্ছামৃত্যু।ইন্ডিয়াতে এই ইচ্ছামৃত্যু বলবত বা গ্রহণযোগ্য নয়।সারা দেশে এই নিয়ে তোলপাড় হয়।তার বন্ধুরাও তার বিপক্ষে চলে যায়।তার এই আবেদন কেউই মানতে পারেনা।সবার চোখেই এটা হেরে যাওয়ার সমান।ইভানকে হেরে যেতে কেউ দিতে যায় না।তার মা ই প্রথম রাজী হয়।ছেলের দুর্বিষহ কষ্টটা মাই আগে বুঝে।আস্তে আস্তে বন্ধুরা।কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ইভানের এই আবেদনটা ইন্ডিয়ান আইনে পাশ হয় না।কারন সে একজন সেলিব্রেটি আর দ্বারা অনেকেই প্রভাবিত হবে।তারপর কিভাবে ইভান তার অসহণীয় কষ্ট থেকে মুক্তি পায় আর কে এই ভুমিকা পালন করে এই নিয়েই মুভিটা।
গানগুলো কেটে দেখেছিলাম তাই দুই ঘন্টায় শেষ করলাম।আমরা আমাদের গন্তব্যে প্রায় চলে এসেছি।মুভির ভেতরে একেবারে ঢূকে গিয়েছিলাম।আমি মুভি দেখে কাঁদার মেয়ে নই তবে অসাধারণ অভিনয় আর পরিচালনায় আমার মনেই ছিল না এটা বাস্তব না।তাই নিজের অজান্তেই কেঁদে কেটে অস্থির।ল্যান্ডিং এর আগে তাই তাড়াতাড়ি চোখ মুখ মুছে নিলাম।আমার মেয়ে আবার ঘুম থেকে উঠে গেল।সে আবার পুরো উদ্যম নিয়ে দুষ্টুমিতে নেমে গেল।ক্লান্ত লাগছিল।ওয়েটিং আমাদের জন্য আমার ছোট মামা ওপেক্ষা করছিল।অনেকদিন পর তাকে দেখে খুব ভালো লাগল।আমারা এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে দাড়ালাম।ঘুম ঘুম আর কান্না ভেজা ফোলা চোখে দেখলাম সিঙ্গাপুরের সুবহে সাদেক।ভোরের ঘাঢ় নীল আকাশ।
(চলবে)

Loading…

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Loading…

অনুভূতি জানানঃ

Facebook fan page

Leave a Reply

Your email address will not be published.