কা ন সূ ত্র

Filed under: ফিচার,সময়ের লাইফস্টাইল |

 

ঐতিহাতিসক কান চলচ্চিত্র উৎসব শেষে প্যারিস ও লন্ডন ঘুরে দেশে ফেরার পর একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাতকারে এ সময়ের সাড়াজাগানো অভিনয়শিল্পী জয়া আহসান তাঁর অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন শেখ সাইফুর রহমানের সঙ্গে। সময়ের কথা’র পাঠকদের জন্য যা নিচে তুলে ধরা হলো-

_MG_7679কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার বিষয়টা জয়া আহসান জন্য আকস্মিক ছিল বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, আসলে এই উৎসবে যাওয়ার স্বপ্ন অভিনয়সংশ্লিষ্ট কার না থাকে! আমারও ছিল। কিন্তু এভাবে আমন্ত্রিত হতে পারবো ভাবিনি। আয়োজক কমিটির হেড অব অ্যাক্রিডিটেশন ডেভিড কাপালডিই আমাকে আমন্ত্রণ জানান। কারণ, চিঠিতে তাঁর স্বাক্ষর ছিল। দুজনের আমন্ত্রণ ছিল। কিন্তু আমি গিয়েছি একা।

এর আগে কানে আমার কখনো হয়নি। এটাই প্রথম অভিজ্ঞতা। আমি গিয়ে নামি নিস এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে গাড়ি করে কান শহরে। মাত্র ২৪ কিলোমিটার। এয়ারপোর্টেই দেখি ভারতীয় নায়িকা আমিশা প্যাটেলকে। তিনি ফিরে যাচ্ছেন। আসলে উৎসব তো শুরু হয়েছিল ১৫ মে। আমি পৌঁছেছিলাম দেরিতে, ২১ মে। এখন মনে হচ্ছে, আরও আগে যাওয়া উচিত ছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মিস করেছি। এই উৎসব বস্তুত ছায়াছবির মহাযজ্ঞ। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। ছোট্ট শহর। উৎসবকে কেন্দ্র করেই যত ভিড়। একটা বিষয় আমাকে সবচেয়ে আলোড়িত করেছে: সবাই ছবির মানুষ। তাঁরা যে দেশেরই হোন, যেটাই হোক তাঁদের মাতৃভাষা, কিংবা যেমনই হোক গায়ের রঙ, এখানে তাঁরা অভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। সেটা ছবির ভাষা। তাই ল্যাংগুয়েজ ব্যারিয়ারটায় আর কোনো বাধা থাকে না। অন্তত আমার সেটাই মনে হয়েছে। আর ভাষার বাধা উতরে যাওয়া গেছে বলেই অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।

রেড কার্পেটে বিশ্বের বিখ্যাত সব অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে আমিÑ এটা ভাবতেই রোমাঞ্চবোধ করি। ভারতের ঐশ্বরিয়া রাই ছিলেন। অন্য শিল্পীরাও। রোমান পোলানস্কি, নিকোল কিডম্যান, মাইকেল ডগলাস, শ্যারন স্টোনদের কাছ থেকে দেখেছি। তবে আমি বেশি খুশি হতাম পেনেলোপি ক্রুজ আর মনিকা বালুচিকে দেখতে পেলে। আমার ভীষণ প্রিয় তাঁরা। অবশ্য বিশেষভাবে আপ্লুত হয়েছি আমার ম্যাটিনি আইডল অড্রে ততুকে দেখে। তিনি উদ্বোধনী ও সমাপনীর সেরিমনি মিসট্রেস ছিলেন। সূচনা মিস করেছি। সমাপ্তি না। ওই দিন ২৬ মে তিনি আবার জুলু ছবির প্রিমিয়ারেও ছিলেন। কাছ থেকে দেখা। না, তাঁর সঙ্গে কথা বলা বা ছবি তোলা হয়নি।

তবে আমার রেড কার্পেট অভিজ্ঞতা অসাধারণ। এখানে ছোটবড় বলে কিছু নেই। সবাই সম্মানিত অতিথি। সবাইকে একইভাবে ট্রিট করে। রেড কার্পেটে হাঁটার সময় আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সেটা অ্যানাউন্স করা হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে গর্বের। আমি আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছি। এটা বিরাট সম্মানের।

আরও নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রথম দিন আমি ভেন্যুতে পৌঁছে রেজিস্ট্রেশন করি। আমার সুভ্যেনির সংগ্রহ করি। সেখানে দূর থেকে বাংলায় আমার নাম ধরে একজনকে ডাকতে দেখে চমকে যাই। ফিরে দেখি এক ভদ্রলোক। তিনি আমাকে কোলকাতায় দেখেছেন আবর্তর প্রিমিয়ারে। ফিল্ম প্রডিউসার। কিছুক্ষণ কথা হলো।

রজনীকান্তের সাত দিনের একটি কর্মশালা ছিল। কিন্তু আমার যোগ দেয়া হয়নি। তবে আমি কয়েকটিতে অংশগ্রহণ করেছি। কয়েকটি সেমিনারে। আর ছবি তো দেখেছিই। সকাল থেকে রাত কোথা দিয়ে যে কেটে গেছে, বলতে পারবো না। আমি চেষ্টা করেছি বিভিন্ন দেশের ছবি দেখতে। আমার ভালো লেগেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ছবি ‘জুলু’, ইরাকি ছবি ‘মাই সুইট পেপার ল্যান্ড’। জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ব্রাজিলিয়ান ও তার্কিশ মুভি দেখেছি। বিশেষত ইরাকি ছবিটার কথা বলতে হয়। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন গুলশিফতা ফারহানি। এই ইরানি অভিনয়শিল্পী বর্তমানে প্যারিসে থাকেন। নির্বাসিত জীবন। গত বছর ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন মাদাম ফিগারোতে নুড পোজ দেয়ায় তাঁর দেশে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ও, আরেকটা ছবির কথা না বললেই নয়। রবার্ট রেডফোর্টের ছবি। একক অভিনয়। ডায়ালগ প্রায় নেই বললেই হয়। একজন নাবিক ও তাঁর সেইলিং বোট। দারুণ।

তবে ইউরোপের ছবি দেখে আমার কেন যেন মনে হয়, ওরা ফ্রাস্ট্রেশনকে বেশি তুলে ধরতে চায়। সে ক্ষেত্রে বিষয়-বৈচিত্র্যে আমাদের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হয়েছে।

‘ব্লু ইজ দি ওয়ার্মেস্ট কালার’। এবার কানে পাম ডি’অর পেয়েছে। ছবিটা সমকামীদের নিয়ে। স্টিভেন স্পিলবার্গ পুরস্কার ঘোষণার পর পরিচালক তাঁর দুই অভিনেত্রীকে নিয়েই মঞ্চে আসেন। কাছ থেকে এসব দেখার স্মৃতি ভোলা সম্ভব নয়।

রোমান পোলানস্কির ‘ভেনাস ইন ফার’ দেখা হয়েছে। গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে। এই অভিজ্ঞতা স্মরণীয়।

মজার অভিজ্ঞতাও অনেক হয়েছে। একদিন রাতে অনুষ্ঠান শেষে আমি খাবারের সন্ধানে বেরিয়েছি। ডিনার করা হয়নি। কিন্তু সব বন্ধ। কী করি! এমন সময় একটি ফ্রেঞ্চ দলের সঙ্গে পরিচয় হয়। ওরাও আমার মতো খাবারসন্ধানী। পরে আমাকে নিয়ে যায় একটি ফ্রেঞ্চ রেস্টোর‌্যান্টে। এটাই সেখানকার সবচেয়ে পুরনো। বোধ হয় ১৮৬০ সালের হবে। নামটা কঠিন, মনে নেই। ওখানে আবার ফরাসিরা ছাড়া অন্যদের প্রবেশাধিকার নেই। কিন্তু ওরা আমাকে ওদের অতিথি হিসেবে নিয়ে যায়। সেখানে ফ্রেঞ্চ ডেজার্ট, বাগেট আর ডাক লিভার খেলাম। সেই রাতে। সেই প্রথম আমার ডাক লিভারের স্বাদ নেয়া। অনবদ্য অভিজ্ঞতা। ফ্রেঞ্চ বাগেট অবশ্য রোজই নাশতায় থাকতো।

তবে যে কদিন ছিলাম, স্যামন খেতে খেতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। তাই শেষে একদিন একটি ভারতীয় রেস্টোর‌্যান্টে গিয়ে বলি আমাদের মতো কিছু একটা করে দিতে। যেটা শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় ভাতভাজি। খেয়ে তৃপ্তি পাই।

এসব উৎসবে আনুষ্ঠানিকতা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবকিছুই সুন্দর করে বলে দেয়া থাকে। আমাকে সেভাবে নিদের্শনা দিয়ে দেয়া হয়। কারণ আমি অতিথি। সেজন্য আমার আনুষ্ঠানিক পোশাক বলা ছিল গাউন। কিন্তু আমি প্রথম চার দিন তা পরিনি। শাড়ি পরেছিলাম। আসলে আমার পক্ষে ম্যানেজ করা সম্ভব হবে না বলে জামদানি পরিনি। শাড়ি ছাড়া গাউন এবং ক্যাজুয়াল পোশাক পরেছি। তবে গাউন না পরায় বরং আমার লাভ হয়েছে। সবাই শাড়ির প্রশংসা করেছেন। আমার পোশাক নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। অনেকেই আমার সঙ্গে ছবিও তুলেছেন। আমার শাড়ি ছিল হট পিংক, ফিরোজা, গোল্ডেন আর মাল্টিকালার। বিশিষ্ট অভিনয় ব্যক্তিত্ব জেসিকা চ্যাস্টেইনও আমার শাড়ির প্রশংসা করেছেন। আমার সঙ্গে ছবি তুলেছেন।

আমার বেশির ভাগই ছিল শিফন শাড়ি। গয়না ছিল একেবারেই হালকা। রোজ ডায়মন্ড দুল, বালা ও সারাভস্কি ব্রোচ। আমি গাউনের সঙ্গে বালা পরেছি যেটা সাধারণত কেউ পরেন না। আমার এই সাজের মধ্য দিয়ে আমি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছি। ব্রোচটা  আমার বোন পাঠিয়েছিল, পরা হয়নি; এবার সেটা পরলাম।  আমার জুয়েলারি ছিল টিফানির। জিমি চু’র শু ও ক্লাচ ছাড়াও পরা হয়েছে গেজ-এর জুতাও।

নিজেই মেকআপ করেছি। তবে অফিশিয়াল সালোঁ পার্টনার ছিল লরিয়েল। তিন দিন হেয়ার ডু করিয়েছি ওদের কাছে।

A22 22 (159) (1)কান থেকে আমন্ত্রণ পাওয়ার পরই কিউবেলার ফারজানা আরমান মুুন্নি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে নানাভাবে সহায়তা করেছেন; চেষ্টা করেছেন পৃষ্ঠপোষণা দেয়ার। এমনকি জিমি চু’র শু তিনি স্পন্সর করেছেন। এ জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

একটা কালো গাড়ি ছিল। আমাকে নামিয়ে দিয়ে যেতো। তারপর এখানে-ওখানে ঘোরা। ছবি দেখা, সেমিনারে উপস্থিত থাকা। বিভিন্ন প্যাভিলিয়নে ঢুঁ মারা। শহরটা ছোট। ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার অংশ। ভূমধ্যসাগরের পারে। এখন সামার। তাই ১২ ঘণ্টা দিন। রাত আটটার দিকে সন্ধ্যা হয়। শহরটি বিখ্যাত লাকজারি শপ, রেস্টোর‌্যান্ট আর হোটেলের জন্য। আছে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান, মিউজিয়াম। ছবি উৎসব ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে আন্তর্জাতিক নানা আসর।

ভারত, ব্রাজিল, তুরস্ক, ইরান এমনকি ইরাকেরও প্যাভিলিয়ন ছিল। নেই বাংলাদেশ। বিষয়টি আমাকে মর্মাহত করেছে। ভারত তো রীতিমতো দাপিয়ে বেড়ায়। এবার তারা ‘বোম্বে টকিজ’ নিয়ে হইচই ফেলেছে। অভিনয়শিল্পী, প্রডিউসার, সাংবাদিকসহ ছবিসম্পৃক্ত নানা পেশার মানুষ সেখানে যান। আমাদের তেমন কেউ যায় না।

এর আগে আমাদের ছবি ‘মাটির ময়না’ কানে দেখানো হয়েছে। আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তারেক মাসুদ। তবে এবার আমি ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন সারা আফরিন (শুনতে কি পাও!) ও শিরিন পাশা (সীমান্তের চড়–ইভাতি)। তাঁরা অংশ নিয়েছেন প্রডিউসার্স নেটওয়ার্কে। যদিও আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে আহমেদ মুস্তাফা জামান ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে।

আমার বারবার মনে হয়েছিল, আমাদের প্যাভিলিয়ন যদি থাকত! আমাদের ছবি যদি থাকত! ছবি নাও যদি থাকে, অন্তত প্যাভিলিয়নে আমাদের পুরনো ছবি, বর্তমানের ছবিসহ নানা খবরাখবর রাখা যেত। অনেকে এসে দেখতো। আমাদের সম্পর্কে ধারণাটা হতো। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেয়া উচিত। আমাকে তো ভারতীয় বলেছে প্রথমে। ভুল ভাঙাতে হয়েছে বারবার। বাংলাদেশ শোনার পরপরই এসেছে সাভার ট্র্যাজেডি প্রসঙ্গ। এটা যে আসবে, তা আমি জানতাম। তাই প্রস্তুত হয়েই গিয়েছিলাম। কথা বলতে হয়েছে খুই বুঝেশুনে।

স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকা, রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল ও একটা অনলাইন টিভি আমার ইন্টারভিউ করেছে।

২৭ মে আমি কান থেকে যাই প্যারিসে। ট্রেনে করে। যাওয়ার সময় মন খারাপ হয়েছে। উৎসব শেষের নিষ্প্রভ দেউড়ি যেন পুরো এলাকা। নামিয়ে ফেলা হচ্ছে বড় বড় হোর্ডিং। এখানে-ওখানে পড়ে আছে উৎসবের সব চিহ্ন। কটা দিন যেন একটা ঘোরের মধ্যে কেটেছে।

আমার প্যারিস যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল নতুন শহর দেখা। যেহেতু আগে যাইনি। আমি ট্রেনের জন্য কান স্টেশনে এসে দেখি প্রচ- ভিড়। উৎসব শেষে সবাই ফিরছেন যে যার গন্তব্যে। বেশির ভাগই ইউরোপের নানা দেশের। অনেক নামিদামি পরিচালক, তারকাও রয়েছেন। সবাই ছায়াছবির মানুষ। আমার মনে হচ্ছিল, যেন মেলা ভাঙার পর ঘরে ফেরার দৃশ্য। ট্রেনে করে প্যারিসে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও দারুণ। এমনিতেই আমার ট্রেন জার্নি পছন্দ। এটা আরও অনেক বেশি উপভোগ করেছি। পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ট্রেন। দু’পাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য। প্যারিসে তিনেক দিনে যতটা পেরেছি ঘুরেছ। লুভ্যরে গেছি। আইফেল টাওয়ারেও। শহরে সাইটসিয়িং করেছি। লন্ডনে আমার ছোট ভাই থাকে। ওর সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটানোর জন্য প্যারিস থেকে চলে যাই ওর কাছে। চেয়েছি। সঙ্গে থেকে যায় কানের স্মৃতি। অনবদ্য, অবিস্মরণীয়।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ক্যানভাস এবং বিভাগীয় উপদেষ্টা, সময়ের কথা লাইফ স্টাইল বিভাগ (বাংলাদেশ)।

ছবি: জয়া আহসানে অ্যালবাম থেকে

 

 

 

 

 

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।