|

জীবনের ডাগ আউটে টিটো ভিলানোভা

tito-২

…. ৪৪ বছর বয়সী এই নিপাট ভদ্রলোক ১৯ জুলাই প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনার কোচ পদ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছেন। প্রাণান্ত ইচ্ছা ছিল, পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে নবদ্যোমে শুরু করবেন নতুন মৌসুম। কিন্তু পারলেন না। অনেকটা বাধ্য হয়ে নামতে হচ্ছে কঠিন এক জীবন যুদ্ধে। এতদিন লড়েছেন ফুটবল নিয়ে, এখন লড়াই মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে….টিটোর সে কঠিন লড়াই নিয়ে সময়ের কথা’ পাঠকদের জন্য লিখেছেন জাহিদুল আলম জয়

 

জীবনের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ফের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছেন টিটো ভিলানোভা। এজন্য ৪৪ বছর বয়সী এই নিপাট ভদ্রলোক ১৯ জুলাই প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনার কোচ পদ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছেন। প্রাণান্ত ইচ্ছা ছিল, পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে নবদ্যোমে শুরু করবেন নতুন মৌসুম। কিন্তু পারলেন না। অনেকটা বাধ্য হয়ে নামতে হচ্ছে কঠিন এক জীবন যুদ্ধে। এতদিন লড়েছেন ফুটবল নিয়ে, এখন লড়াই মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে। জীবনের এই লড়াইয়ে সবাইকে পাশে পাচ্ছে টিটো। বার্সেলোনার প্রিয় ফুটবলার, ক্লাব কর্মকর্তা থেকে শুরু করে গোটা ফুটবলবিশ্বই সাহস যোগাচ্ছেন, আশ্বস্ত করছেন ভিলানোভাকে। সবার ভালবাসায় তাই আবেগাল্পুত সদ্য সাবেক হওয়া বার্সা কোচ। বিদায়ের ঘোষণা দেয়ার পরদিনই টিটো ভিলানোভা লিখেছেন খোলা চিঠি। বার্সেলোনার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই চিঠিতে ক্লাব, ভক্ত ও শুভাকাক্সক্ষীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন ক্যান্সার আক্রান্ত এই কোচ। সেই সঙ্গে ক্যাটালানদের পরবর্তী কোচের জন্যও শুভকামনা জানিয়েছেন।

টিটোর লালা গ্রন্থিতে যে টিউমারটি ধরা পড়েছিল সেটি ২০১১ সালের নভেম্বরে অপসারণ করা হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে আগের অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে আবারও অস্ত্রোপচার করতে হয় তাঁকে। শুধু তাই নয়, ক্যান্সার থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ নিউইয়র্কে কেমোথেরাপি ও  রেডিওথেরাপি নিয়েছেন। গত মার্চে বার্সেলোনায় ফিরে দলকে স্প্যানিশ লা লীগার শিরোপা পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু লৌহ মানসিকতার ভিলানোভাকে তৃতীয়বারের মতো নামতে হচ্ছে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। পারবেন কি তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে? প্রশ্নটা আপাতত সময়ের হাতেই বন্দী।

 

পারবেন কি তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে? প্রশ্নটা আপাতত সময়ের হাতেই বন্দী

পারবেন কি তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে? প্রশ্নটা আপাতত সময়ের হাতেই বন্দী

 

কিছুদিন আগেও সাবেক কোচ পেপ গার্ডিওলার সঙ্গে স্প্যানিশ জায়ান্ট ক্লাব বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট সান্ড্রো রোসেলের কথার লড়াই চলছিল। ইস্যু টিটো ভিলানোভা। গার্ডিওলার সময়ে সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ভিলানোভা। তবে গার্ডিওলা দায়িত্ব ছাড়ার পর গত মৌসুমের প্রথম দিকেই ভিলানোভার শরীরে ভয়ালব্যাধি ক্যান্সার ধরা পড়ে। এ কারণে মৌসুমের শেষদিকে এসে বার্সা আশানুরূপ কিছু করতে পারেনি। আর এ বিষয়টিকে পুঁজি করে রোসেলের সঙ্গে বিতর্ক শুরু হয় গার্ডিওলার। বর্তমান বেয়ার্ন মিউনিখের কোচ গার্ডিওলার দাবি ভিলানোভার অসুস্থতাকে ব্যবহার করে অনেক বেশি চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে তাঁর ওপর। তবে এসব তর্কের ইতি ঘটেছে। গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত ভিলানোভা কোচের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ক্যান্সারের আরও উন্নততর চিকিৎসার জন্যই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বার্সা প্রেসিডেন্ট রোসেল নিজেই এ কথা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যেই প্রাক-মৌসুম অনুশীলন শুরু করেছে বার্সা। কিন্তু ভিলানোভা যোগ দিতে পারেননি। এখন কোচ হারিয়ে বার্সাকে নতুন কোচের সন্ধান করতে হচ্ছে। ২০১১ সালের নভেম্বরে ভিলানোভার স্যালিভারি গ্ল্যান্ড থেকে একটি টিউমার অপসারণ করা হয়। তবে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে আবার নতুন করে একই সমস্যায় পড়েন তিনি। এরপর নিউইয়র্কে টানা ১০ সপ্তাহ ধরে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি নিয়েছেন এবং অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। গত মার্চে পুনরায় বার্সা শিবিরে ফিরে আসেন। স্প্যানিশ লা লীগা তাঁর কর্মদক্ষতাতেই জিততে সক্ষম হয় ক্যাটালানরা। ভিলানেভার অব্যাহিত প্রসঙ্গে  রোসেল এক জরুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রুটিনমাফিক বিশ্রাম কাটানোর পর ভিলানোভার পরিস্থিতি যাচাই করে দেখেছেন ডাক্তাররা। এরপর তাঁকে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এমন অবস্থায় বার্সার প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবেনা তাঁর পক্ষে। চিকিৎসার চলমান প্রক্রিয়ার জন্য তাঁর পুরো পরিবারের প্রতি সবাইকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছি।’ ভিলানোভার চিকিৎসার জন্য চলমান প্রক্রিয়াগুলোর যেন গোপনীয়তা থাকে সেজন্য সংবাদ মাধ্যমকে আহ্বান জানিয়েছেন রোসেল।

প্রিয় ক্লাবের বিদায়বেলায় হৃদয় ভারাক্রান্ত ছিল ভিলানোভার। সবার উদ্দেশে লেখা চিঠিতে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। চিঠির শুরুতেই ভিলানোভা লিখেন, ‘ধন্যবাদ বার্সাকে। ধন্যবাদ সবাইকে।’ এরপর তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর দলের সঙ্গে থাকার পর বার্সার কোচ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল আমার। সময় এসেছে পেশাদারী জীবনে পরিবর্তন আনার, দেড় বছর আগে শরীরে যে রোগ বাসা বেঁধেছে তার দিকে পূর্ণ মনোনিবেশ করার।’ সাবেক বার্সেলোনা ফুটবলার বলেন, ‘চিকিৎসকদের পরামর্শ ও চিকিৎসার স্বার্থে সেটাই করতে হচ্ছে। বার্সেলোনার  মতো একটা ক্লাবের প্রধান কোচ হিসেবে যতটা সময় দেওয়া দরকার, তা দিতে পারছি না। কিন্তু প্রাণের এই ক্লাবের সঙ্গে চিরদিনই কাজ করে যাব আমি।’ তিনি বলেন, ‘এখানকার খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়া সহজ নয়। তাঁদের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আপনারা আমাকে যা দিয়েছেন, সবকিছুর জন্যই আমি সবার কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’

চিঠিতে প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনাকে সবার সেরা হিসেবে অভিহিত করে টিটো। যেকোন পরিস্থিতিতে, যেকোন মুহূর্তে সেরা সাফল্য পেতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। ভবিষ্যতেও বার্সা দুর্দান্ত সব সাফল্য পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি, ‘এই ফুটবল দল যে কোন প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে সক্ষম। নিজেদের দক্ষতা দিয়ে পরবর্তী মৌসুমে যে কোন চ্যালেঞ্জ নেয়ার যোগ্যতা  খেলোয়াড়দের আছে। আগামী দিনে বার্সার খেলা সবার কাছে আরও রোমাঞ্চকর মনে হবে, এই প্রত্যাশা করছি।’ চিঠিতে বার্সেলোনার সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সাবেক এই মিডফিল্ডার। বিশেষ করে বার্সার বোর্ড প্রেসিডেন্ট ও ক্রীড়া পরিচালকের প্রতি বিশেষ কৃতিজ্ঞতা প্রকাশ করেন, ‘আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই চেয়ারম্যান, বোর্ড ও স্পোর্টিং ডাইরেক্টর আন্তোনি জুবিজারেটাকে। তাঁরা সবসময় আমাকে আত্মবিশ্বাস ও সাহস জুগিয়েছেন।’ এছাড়া টিটো ধন্যবাদ জানিয়েছেন চিকিৎসক রোমান ক্যানাল ও তাঁর সহযোগীদের। যাঁরা তাঁর ক্যান্সার চিকিৎসায় রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জুগিয়ে চলেছেন মানসিক শক্তি।

গার্ডিওলার সহকারী হিসেবে পাঁচ বছর থাকার পর মূল কোচ হওয়ার প্রসঙ্গ এনে ভিলানোভা বলেন, ‘গার্ডিওলার সহকারী হিসেবে কাজ করাসহ অত্যন্ত চমৎকার পাঁচটি বছর কাটানোর পরে জীবনে এমন একটি মুহূর্তে আমি উপনীত হয়েছি যেখানে আমার পেশাদার জীবনে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। যে দলের সঙ্গে আমি ছিলাম তারা যে স্বপ্ন পূরণ করেছে তা প্রতিটি কোচেরই কাম্য। আড়াই বছর আগে আমার যে অসুস্থতা ধরা পড়েছে সে কারণে আমি আমার  পেশাদারী জীবন ছেড়ে এখন তার সঙ্গে লড়াই করার জন্য আমার সব শক্তি উৎস্বর্গ করেছি।’

hh

আমি এখন কঠিন সময় অতিবাহিত করছি

বাধ্য হয়ে কোচ পদ ছাড়তে হলেও বার্সেলোনাকে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশই মনে করেন ভিলানোভা। বিগত দিনের মতো ভবিষ্যতেও বার্সাকে পাশে পাওয়ার আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় বার্সার অংশ হয়ে থাকব। ক্লাব দীর্ঘ সময় আমার প্রতি যে সমর্থন দিয়ে আসছে, আশা করছি ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।’ বিদায়ী চিঠিতে ক্লাব, ভক্ত, সমর্থক সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভিলানোভা বলেন, ‘শুধু এই মুহূর্তে নয়, কয়েক মাস ধরে আমার প্রতি যে ভালবাসা আপনারা দেখিয়েছেন, এ জন্য ধন্যবাদ। আমি এখন আগের চেয়ে ভাল আছি। পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে চিকিৎসার নতুন পর্যায় শুরু করতে যাচ্ছি। আশা করছি, সবকিছু ঠিকমতোই হবে।’ জীবনের কঠিন এই মুহূর্তে যারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে উৎসাহ দিয়ে বার্তা পাঠানোয় ফুটবল সমর্থক, সহকর্মী, ক্লাব, এ্যাথলেট ও পরিচিতদের ধন্যবাদ। তাঁদের বার্তা পেয়ে আমি ও আমার পরিবার আনন্দিত। আমি এখন কঠিন সময় অতিবাহিত করছি।

জীবনের কঠিনতম এই সময়ে সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্বশীলতাও আশা করছেন ভিলানোভা। সেই সঙ্গে বার্সার পরবর্তী কোচের প্রতিও শুভকামনা জানিয়েছেন, ‘আমি সংবাদ মাধ্যমের সহায়তা ও দায়িত্বশীলতা আশা করছি। যেহেতু বার্সার কোচের দায়িত্ব ছেড়েছি, তাই এই মুহূর্তে নিজের ও পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারটা প্রত্যাশা করছি আমি। পরবর্তী কোচ ও বার্সার সফলতা কামনা না করে চিঠিটি শেষ করতে পারছি না। আমি এই চিঠিটি একটি বিষয়ের মাধ্যমে শেষ করতে চাই। সেটা হলো বিশ্বের সেরা ক্লাবের পরবর্তী নতুন কোচকে আমি স্বাগত জানাতে চাই এবং তার ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানাতে চাই।’

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা