|

হৃদয়ছোঁয়া বিপণিবিতান ওয়েস্ট এডমন্ডন

 A-1

 

মলের ভেতোর ঢুকে তো আমি হতবাক! মলটাকে দর্শক-ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয়, দর্শণীয় আর গ্রহণযোগ্য করে তুলতে কোথাও চেষ্টার ত্রুটি রাখা হয়নি। চমৎকার আঙ্গিকে চিত্তাকর্ষক সুশোভিত এবং সুসজ্জিত নয়নাভিরাম দোকানপাট, দর্শকদের নয়ন-মনকে আকৃষ্ট করতে মার্কেটের করিডোর, প্যাসেস সর্বত্র গড়ে তোলা হয়েছে দর্শনীয় সব শৈল্পিক স্ট্যাচু, চিত্রকর্মসহ নানা ধরণের কাব্যিক ও সুন্দরতম উপস্থাপনা….এডমন্টন মল ঘুরে এসে সময়ের কথা’র পাঠকদের জন্য লিখেছেন মাহাবুবুল হাসান নীরু

 

বিশ্বখ্যাত ওয়েষ্ট এডমন্ডন শপিং মলের কথা অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি। অনেক আগ্রহ ছিলো গীনেস বুকে স্থান পাওয়া এই সর্ববৃহৎ মলটি দেখার এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার। কিন্তু সাধ থাকলেই তো আর হয় না, সাধ্য-সামর্থ্য, সেই সাথে সুযোগও থাকতে হয়। মন্ট্রিয়লের তাবু গুটিয়ে গত জানুয়ারিতে ক্যালগেরি আসার পর হতেই সেই আগ্রহটা থেকে থেকেই মনের কোণে উঁকি-ঝুকি মারছিলো। মাত্র তিন ঘন্টার ড্রাইভ ক্যালিগেরি থেকে এডমন্টন। বলতে গেলে ঘরের পাশেই। আমার আগ্রহের কথা শোনার পরই বন্ধু মাখন ও সায়লা বেশ উৎসাহের সাথে বললো, ‘তোমার শরীরটা ভালো থাকলে অবশ্যই আমরা সেখানে  যাবো’। কিন্তু লাগাতার শরীরটা ভালো না যাওয়ার কারণে ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হচ্ছিলো না।

গত ৩১ মার্চ শনিবার একটা সুযোগ মিললো। সিদ্ধান্ত হলো সকালে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরবো। ব্যাধির আচরণটা অনুকুলে ছিলো। আমরা পাঁচজনের পরিবারটা বেরিয়ে পড়লাম সকাল ন’টার মধ্যে। বন্ধু মাখন ড্রাইভ করছিলো ওর ছাই রঙের কিয়া ভ্যানটি। ওর পাশে আমি, পেছনে সায়লা এ ওদের দু’টি সন্তান আঁচল ও আবেশ। যথাযথারীতি সায়লা পথের জন্য টুকটাক মুখরোচক খাবার নিয়েছে। গপসপের  সাথে সেসব খেতে খেতে তিন ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে এডমন্টন মলের পার্কিয়ে আমাদের গাড়ি পৌঁছালো বারোটা নাগাদ। মল কর্তৃপক্ষ গাড়ি রাখার সুবিশাল সু-বন্দোবস্ত করে রেখেছে। বিভিন্ন সাইজের পার্কিং লটগুলোতে রাখা হয়েছে একই সাথে বিশ হাজার গাড়ি রাখার ব্যাবস্থা। তারপরও পার্কিং পেতে মিনিট দশেক চরকির মতো ঘুরতে হলো। রাস্তা থেকে বিপনিবিতাণটির বাইরের সৌন্দর্য দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের অপরূপ  দর্শনীয় নির্মাণশৈলী যে কোনো দর্শকের মন কাড়বেই। অনেক দেখার আগ্রহ যখন কোনো কিছুকে ঘিরে মনের ভেতোর কাজ করে, আর এক সময় সেই জিনিসটা যখন চোখের সামনে এসে যায় ত‌খন স্বাভাবিকভাবে একটি উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা মন জুড়ে। আমারও একই দশা হলো। একটা উত্তেজনা অনুভব করলাম মলের ভেতোরে ঢুকতে গিয়ে।

মলের ভেতোর ঢুকে তো আমি হতবাক! মলটাকে দর্শক-ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয়, দর্শণীয় আর গ্রহণযোগ্য করে তুলতে কোথাও চেষ্টার ত্রুটি রাখা হয়নি। চমৎকার আঙ্গিকে চিত্তাকর্ষক সুশোভিত এবং সুসজ্জিত নয়নাভিরাম দোকানপাট, দর্শকদের নয়ন-মনকে আকৃষ্ট করতে মার্কেটের করিডোর, প্যাসেস সর্বত্র গড়ে তোলা হয়েছে দর্শনীয় সব শৈল্পিক স্ট্যাচু, চিত্রকর্মসহ নানা ধরণের কাব্যিক ও সুন্দরতম উপস্থাপনা।

৫,৩০০,০০০ বর্গ ফুট এলাকা জুড়ে গড়ে উঠা এই বিশ্বখ্যাত শপিং মলটিতে পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত ব্রান্ডের শো-রুম আছে। গোটা বিপনিবিতাণ জুড়ে রয়েছে আটশ’ দোকান।

নানা পণ্যে শু-শোভিত, চিত্তহরা এসব শো-রূমে জিনিষপত্রের দামও অন্যসব বড় মলগুলোর তুলনায় কম, অন্তত আমার কাছে তেমনটিই মনে হয়েছে। আর যার কারণে এটিকে মধ্যবিত্তের বড় শপিং মলও বলা হয়ে থাকে।

পৃথিবীর সেরা বলেই হয়তো প্রতিদিন প্রচুর দর্শক-ক্রেতার সমাগম ঘটে মার্কেটটিতে। যাদের মধ্য পর্যটকের সংখ্যাই বেশি। দেখার আগ্রহের সাথে কেনাকাটা সব মিলিয়ে স্বাভাবিকভাবে মলটি তাবৎ বিশ্বের মানুষকে টানে। প্রতিদিন ষাট হাজার থেকে দেড় লাখ দর্শকে-ক্রেতা মলটি ভিজিট করে থাকে। আর বছরে ৮.২ মিলিয়ন মানুষ যাতায়াত করে থাকে এ মলটিতে। অবশ্য বিশেষ দিন ও ঋতুর ওপরে এ দর্শকের বাড়াকমা নির্ভরশীল।

ওয়েস্ট এডমন্টন মল প্রথম ১৯৮১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দর্শক-ক্রেতা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ওপেন করার পর ১৯৮৩, ১৯৮৫ ও ১৯৯৯ সালে তিনবার বাড়ানো হয় এর পরিধি। দু’হাজার চার সাল পর্যন্ত এটি ছিলো গীনেস বুকে স্থান পাওয়া বিশ্বের এক নম্বর বিপনিবিতাণ, ১৯০৪ সালে চতুর্থবারের মতো দোকানী ও পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য একটি গাইডলাইন হিসেবে রঙিন কোডেড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।
আজ থেকে ৩২ বছর আগে ঘেরমেজিয়ান ভাইয়েরা যখন ইরান থেকে এসে কানাডায় বসবাস শুরু করেন, তখন থেকেই তাদের ইচ্ছে ছিলো একদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বিপণিবিতান তৈরি করবেন তাঁরা কানাডায়। তখন সেই স্বপ্ন পূরণ না হলেও পরবর্তীতে দুই ঘেরমেজিয়ান ভাই কানাডার এডমন্টনে প্রতিষ্ঠা করেন কেনাকাটার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শপিং কমপ্লেক্সটি। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় বরফ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি স্কেটিং রিংঙ্ক, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও ঢেউ তোলা সুইমিং পুল। ওয়েস্ট এডমন্টন মলই প্রথম বিপণিবিতান যা শপিং মল সম্পর্কে মানুষের ধ্যাণ-ধারণাকে সম্পূর্ণ ভাবে পাল্টে দেয়।

যদিও সময়ের পরিক্রমায় এটি তার শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারেনি। তারপরও এখনো এটাকে বিশ্বের তিন নম্বন বলা হয়ে থাকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এখন বিশ্বের সেরা বেইজিংয়ে গড়ে ওঠা শপিং মলটি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দুবাই শপিং মল।

বিশাল ওয়েষ্ট এডমন্টন। গোটা মলটাকে ভালোভাবে ঘুরে-ফিরে দেখা একদিনের কম্ম নয়। তারপরও যথাসম্ভব আমরা ঘুরে-ফিরে দেখতে লাগলাম। সাথে চললো সায়লার টুকটাক কেনাকাটা। সায়লার প্রিয় শো-রুম ব্রান্ডেড হলষ্টার, পাশাপশি গ্যারাজ, অ্যামেরিকান ঈগলস, ওয়েষ্ট ফোরটি নাইন, স্প্রিং, বেড এন্ড বার্থ এবং এইচ এন্ড এম থেকে ও পরিবারের সকলের এবং বাসার জন্য কেনাকাটা করলো। সকার শপ থেকে পুত্র আবেশের জন্য কিনলো দু’টি জার্সি। আর্জেন্টাইন সুপারস্টার মেসি হচ্ছে আবেশের প্রিয় খেলোয়াড় আর তাই মেসি’র নাম সম্বলিত জার্সিই পছন্দ করলো সে। ক্যালগেরিতে স্পোর্টসের দোকান থাকলেও কোনো দোকানেই বিশ্বের সেরা সব খেলোয়াড়ের নাম সম্বলিত জার্সি পাওয়া যায় না। অথচ আবেশের পছন্দ হচ্ছে নাম লিখিত জার্সি। আর ছেলের এই শখটা মেটাতেই মূলত সায়লা এ মলটিতে এসে থাকে প্রতি বছর অন্তত একবার। এ ছাড়া গত ছ’বছর যাবৎ আবেশের বার্থডেটাকেও ওরা এ মলটিতে সেলিব্রেট করে আসছে এবং প্রতিবারই জন্মদিনের বিশেষ উপহার হিসেবে ওকে জার্সি কিনে দেয়।

মাখন-সায়লা এ মলে আগেও অনেকবার এসেছে, আমিই প্রথমবার এলাম। আর তাই আমার চোখের সামের অভূতপূর্ব এক রঙিন জগত। ভালোলাগা, ভারোবাসার মতোই। আমি খুব আগ্রহভরে দেখছিলাম সবকিছু। দুপুরে আমরা ফুটকোর্টে লাঞ্চ সারলাম। একটা এ্যারাবিক ‌খাবার দোকান থেকে খাবার কিনলাম। বিশালাকার ফুটকোর্ট। গিজগিজ করছে মানুষ।

মলের অভ্যন্তরে সবচাইতে আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ওয়াটার পার্ক। এটি বলা হয়ে থাকে কোনো বিপনিবিতাণের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ওয়াটার পার্ক। যদিও সময় স্বপ্লতার কারণে আমরা সেখানে প্রবেশ করিনি। কিন্তু পার্কের সৌন্দর্য আর স্ফটিক ঢেউতোলা জল দেখে বড্ড ইচ্ছে করছিলো ছুটে গিয়ে জল নামতে। সময় কম, তাই ইচ্ছেটাকে তুলে রাখলাম আগামীর জন্য। এই পার্কটি ওপেন করা হয় ১৯৮৬ সালে। এর ধারণ ক্ষমতা ১২.৩ লক্ষ লিটার পানি। এর গড় তাপমাত্রা ৮৬-৮৯ ডিগ্রী ফারেনহাইট। এর পানিতে ঢেউ খেলা করে, ঘূর্ণিঝড় হয়। বেশ উপভোগ্য যে তা বলাইবাহুল্য।

গ্যালাক্সিল্যান্ড হচ্ছে এই মলের আর একটি অন্যতম আকর্ষণ। এর নাম পূর্বে রাখা হয়েছিলো ফ্যান্টাসিল্যান্ড, তবে নামকরণ নিয়ে জটিলতার কারণে তা পরিবর্তন করে রাখা হয় গ্যালাক্সিল্যান্ড। এখানে আছে বিশ্বের সবচে’ লম্বা ও দীর্ঘতম বেলুন কোষ্টার। যা দর্শকদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। এখানে শীল মাছের দর্শনীয় ক্রীড়াশৈলী অনেকটা সময় ধরে উপভোগ করলাম। বেশ লাগলো একটি জলজ প্রাণীর অবিকল মানুষের মতো আচার-আচরণ। প্রাণীটি দর্শণীর বিনিময়ে আগ্রহী মানুষের সাথে ছবি তুলছে, হ্যান্ডসেক করছে, গালে চুমো খাচ্ছে! অদ্ভূৎ কায়দায় আকর্ষণীয় সব খেলা দেখাচ্ছে। এখানে দেখার আরো অনেক কিছুই আছে। আছে পুরোনো দিনের বিশালকার পালতোলা জাহাজ। বেশ লাগলো। আছে আরো আরো অনেক কিছু।

আইস প্রাসাদ বা আইস প্যালেস মলের আর একটি বড় আকর্ষণ। এটি আসলে একটি হকির মাঠ। এখানে অনুশীলনের পাশাপাশি হকির টুর্ণামেন্টও হয়ে থাকে।

মলের ভেতোর রয়েছে বিশালাকাল বিলাসবহুল ‘ফ্যান্টাসিল্যান্ড’ হোটেল। এছাড়া ৯০, এভিনিউতে মল সংলগ্ন রাস্তা জুড়ে রয়েছে দ্বিতীয় মল সংযুক্ত ‘ওয়েষ্ট এডমন্টন মল হোটেল। মলে রয়েছে প্রথম ভিক্টোরিয়া সিক্রেট, রয়েছে ওয়ার্ল্ড শ্যুটিং সেন্টার, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের স্মৃতিবিজরিত সান্তা মারিয়া জাহাজ, আচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য এর ডেক ভাড়া করা যায়। রয়েছে চব্বিশ ঘন্টা গোল্ড জিম। ডিনার থিয়েটার, ডিনারের মনোমুগ্ধকর পরিবেশে পরিবেশন করা হয় কানাডার তিন ধরণের বাদ্যযন্ত্র। রয়েছে নাইট ক্লাব, ইন্টারনেট ক্যাফে, একটি আন্তঃসম্প্রদায়গত চ্যাপেল, চারটি রেডিও স্টেশন, বিনামূল্যের একটি ছোট যাদুঘর, কয়েকটি থিম এলাকায় ক্লাব, রেস্তোরা, বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, জঙ্গল জিম, কমেডি ক্লাব, চায়না টাউনের একটি টি-এন্ড-টি মার্কেট ইত্যাদি। আসলে এ বিশাল মলটির সবকিছুর বর্ণনা দিতে গেলে অনেক পরিসরের দরকার, সেটা তো আর সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে সাত ঘন্টা ছিলাম মলটিতে। এতোবড় মলকে ঘুরে-ফিরে দেখার জন্য সাত ঘন্টা সময় কিছুই না। ইচ্ছে আছে আগামী অন্ততঃ দু’দিনের সময় নিয়ে আবার যাবো ওয়েস্ট এডমন্টন মলে।

কানাডার আলবার্টা প্রভিন্সের এডমন্টনে অবস্থিত এডমন্টন শপিং মলটি সপ্তাহের সাতদিনই খোলা থাকে। প্রতিদিন সকাল দশটায় খুলে বন্ধ হয় রাত ন’টায়। ঠিকানাঃ 8882 170 NW, ADMONTON, ALBERTA, B.C.  CANADA.  ফোনঃ 1780 444-5200.

 

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা