|

তয় তাদের কিসের এতো ভয়

চয়ন

  তয় তাদের কিসের এতো ভয়!

 

ড় চাচা, আমি, কমলা আর মুরাদ গাড়িতে করে উত্তরা থেকে মতিঝিল যাচ্ছিলাম। বড় চাচা বড় মনের মানুষ। সব সময়ই চেহারায ফুটে থাকে একটা নিপাট ব্যাক্তিত্বের ছাপ। কথা-বার্তায় সর্বদা ধীর-স্থির। বসে আছেন আমার পাশে পেছনের সিটে। বড় চাচার ওপাশে মুরাদ। বড় চাচারই বড় ছেলে। একটা আবাল! বয়স টুয়েন্টি নাইন, কিন্তু মগজে ফাইভ! কো‍থায় কি করতে হবে; কোথায়, কিভাবে চলতে হবে সেটা যেনো বোঝার মতো বয়স ওর এখনো হয়নি। একটা উদাহরণ দিলেই বুঝবেন, ও কতোটা গাধা। এ যুগে এমন গাধার সন্ধান কোটিতেও একটা মিলবে কিনা সন্দেহ।

সেদিন মৌচাক মার্কেটের অপর পাশের ফুটপাত ধরে মুরাদ আর আমি পাশাপাশি হাঁটছিলাম। ঠিক আমাদের সামনে দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলো এক অত্যাধুনিক তরুণী। ওকে ‘তরুণী’ না বলে ‘সরুণী’ বললেও বুঝিবা ভুল হবে না। ছিলিম ফিগার। সরু সরু হাত-পা, কোমড়। দেখলেই বোঝা যায়, না খাইয়া, না দাইয়া গতরডারে হেয় এমুন বানাইছে। আল্লাই মালুম, হাছাই ফিলিমে কাম করবার ইচ্ছে আছে কি না। পোশাক-আশাকেও যারে কয় ওভার ইস্মাট! বিশাল গলাকাটা পাতলা কামিজ পরণে‍। পেছনে পিঠের অর্ধেকটাই ‌খোলা। যদিও কামিজের নিচে একটা সেমিজও আছে, তয় পরণের কামিজ আর সেমিজ এতোটাই পাতলা যে সে সব ভেদ করে স্পষ্ট হয়ে আছে ব্রা’র পেছনের দিকের অস্তিত্ব। আর আমাদের মুরাদ আবাল সেদিকে হাবার মতো হাঁ করে তাকিয়ে থেকে আমাকে সত্যি সত্যিই বলদের মতো প্রশ্ন করে বসলো, ‘আচ্ছা চয়ন, ঐ যে জামার নিচে..মেয়েরা ঔটা পরে কেনো?’

কনতো দেহি কেমুন প্রশ্ন! আমি বয়সে ওর ছোট তো বটেই; তার ওপর চাচাতো বোন! সেয়ানা। অবশ্য এইসব আবাইল্যাপনার কারণে বয়সে বড় হইলেও আমিও মুরাদরে তেমন একটা পাত্তা দেই না। নাম ধরে তো ডাকিই; সুযোগ মতো চাপার বাড়ি লাগাই, মওকা পেরে কিল-গুতা।

চলতে চলতেই আমি থমকে দাঁড়ালাম ওর প্রশ্ন শুনে। আমার তপ্ত চোখের ওপর চোখ রেখে মুরাদ কুঁকড়ে গেলো। আমতা আমতা করে বললো, ‘কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে চাওয়া কি অন্যায়?’

আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম,’জ্বী না, অন্যায় নয়, যদি সেটা অন্তর্বাস সংক্রান্ত না হয়।’

মুরাদ আর কোনো কথা বলেনি সেদিন।

আজ চলন্ত গাড়িতে একেবারে বড় চাচার পাশে বসেই সে আমাকে প্রশ্ন করে বসলো, ‘চয়ন, পত্রিকায় খবরটা কি পড়েছিস?’ আমাকে কোনো উত্তরের সুযোগ না দিয়ে নিজেই আবার বলে উঠলো, ‘শাশুড়ির সাথে বিএনপির এক নেতা রফিক কীসব আকাম-কুকাম করেছে! পেপারে পড়েছি। ‍শ্বাশুড়ির সাথে বুঝি ঐসব করা যায়!’

CHAহায়, হায়! বলে কী আবালটায়! বড় চাচার তো ইজ্জত যায়!

মুরাদের কথা শুনে আমি বড় চাচার মুখের দিকে তাকালাম। বড় চাচা বেশ থমথমে কন্ঠে বললেন, ‘পত্রিকাওয়ালারা এই সব বাজে খবর কেনো যে ফলাও করে ছাপে!’

মুরাদ বলে উঠলো, ‘তাতে পেপার বেশী বেঁচা হয় বাবা। আমার তো এই সব খবর পড়তেই বেশি ভালো লাগে! হে: হে: হে:।’

‘চুপ!’ মুরাদের কথা শুনে বড় চাচা ওকে একটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোর কি বোধ-বুদ্ধি কোনোদিনই হবে না!’

মুরাদ বড় চাচার কথার পিঠেই বলে উঠলো, ‘মনে হয় সে আশা আর নাই বাবা। বয়স তো আর কম হলো না। তবে বাবা, এই আমি বলে রাখলাম, আমি বিয়া করলে কিন্তু কোনোদিন শ্বাশুড়ির সাথে ঐসব করবো না।’

মুরাদের কথায় আমি হাসবো, নাকি কাঁদবো ভেবে পেলাম না।

বড় চাচার মুখময় কেউ যেনো এক পোঁচ কালি মেখে দিলো।

আমি মুরাদকে একটা ধমক দিয়ে বললাম, ‘যার নয়-এ হয় না, তার নব্বুইয়েও হয় না। তোর আর হবে না। কিন্তু মানুষ দেখে-শুনেও তো কিছু শেখে, নাকি?’

মুরাদ কোনো কথা বললো না।

মুরাদকে ধমকের পর আমি চুপচাপ বসে ভাবতে লাগলাম, কী ফুলের মতোই না পবিত্র আমাদের পলিটিশিয়ান রফিকরা! পাঁচ বছর যাবৎ শাশুড়ির সাথে অনৈতিক সম্পর্ক! ভাবতেও ঘেন্না লাগে! আবার পত্রিকাওয়ালারা সেটা ফলাও করে প্রচার করে পয়সা কামায়! কী জঘন্য, নোংরা রিপোর্ট! সপরিবারে পড়া যায় এমন সংবাদ! হায় এ কোন যুগে এসে জন্মা‌লাম!

আমাদের গাড়িটা জ্যাম ঠেলে ধীর গতিতে এগুচ্ছিলো। কমলা সামনে সিটে এতোক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলো। কমলা সম্পর্কে আমার ফুপাতো বোন। আমার চাইতে বয়সে তিন বছরের ছোট। তা হলে হবে কি। সম্পর্কটা বন্ধুর মতোই। বেশীর ভাগ সময় চলাচল আমার সাথেই। এতোক্ষণ বসে বসে আমাদের কথাগুলো সে গিলছিলো। এবার বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘দ্যাখ আপা, আওয়ামীলীগ তাদের বিলবোর্ড দিয়ে ঢাকা শহরটাকে কেমন করে ছেঁয়ে ফেলেছে। সব বিলবোর্ডেই নিজেদের শাসনামলের গুণকীর্তণ! আরে বাবা, এতোই যদি উন্নয়নের জোয়ার তারা বইয়ে দিয়েছে; তবে আর বিলবোর্ড কেনো? পাবলিকের তো এমনিতেই নৌকা মার্কায় সিল মারার কথা। তবে কিসের ভয়ে তাদের দিল এতো তড়পায়?

কমলার প্রশ্নের উত্তরে আমি কি বলবো, ভেবে পাচ্ছিলাম না। তবে বড় করে একটা শ্বাস টেনে ‘ওয়াক’, ‘ওয়াক’ করতে লাগলাম।

বড় চাচা জানতে চাইলেন আমার কি হয়েছে।

আমি বললাম, ‘বমি আসছে।’

‘বমি আসছে!’ কমলা বলে বসলো, ‘এই না এতোক্ষণও ভালোই ছিলি!’

বললাম, ‘ছিলাম। এখন নেই।’

‘কেন?’ কমলার প্রশ্ন।

আমি বললাম, ‘বড় করে শ্বাস নিতে গিয়ে বিলবোর্ডগুলোর যতো দুর্গন্ধ সব নাকের ভেতোর ঠুকে গেছে। গা গুলিয়ে উঠছে! ইস কী দুর্গন্ধ রে বাবা!’

বড় চাচা গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘কী সব যাতা বকছিস!’

আমি ফোঁস করে বলে উঠলাম, ‘ঠিকই বলছি বড় চাচা, শিক্ষিত লোকেরা যখন অশিক্ষিতের মতো কাজ করে তখন, না বকে আর উপায় কী! একটা কথা আমি কিছুতেই ভেবে পাই না যে, আওয়ামী লীগে কি এমন মানুষের এতোই অভাব, যে কি না ভালো-মন্দ বোঝে না! উন্নয়নের সুগন্ধ ছড়ানোর জন্য তারা যেভাবে বিলবোর্ড দখল করে প্রচারে নেমেছে, তাতে কি বিলবোর্ড থেকে সত্যিই সুগন্ধ ছড়াচ্ছে? যত্তোসব জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারির দল এসে জুটেছে রাজনীতিতে।’

আমার কথাগুলো যে বড় চাচার মোটেও পছন্দ হলো না সেটা তার মৃখাকৃতি দেখেই বুঝলাম।

তবে আমিও আর কোনো কথা বললাম না।

পাশে বসা মুরাদও এ সময় বলে বসলো, ‘চয়ন, তোর মতো আমারো নাকে দুর্গন্ধ ঢুকে গেছে। আমারো যে বমি আসছে।’

আমি ধীর কন্ঠ কমলাকে বলতে লাগলাম, কমলা, গতকাল ফেসবুকে এক বন্ধু লিখেছে, একটা বিলবোর্ড তৈরিতে সর্বনিম্ন খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা, আর ঢাকায় একটা বিলবোর্ড ভাড়াও অন্যান্য অনুষঙ্গে সর্বনিম্ন ব্যয় হয় ৩ লাখ টাকা। ঢাকা যেভাবে বিলবোর্ডে সয়লাব হয়ে গিয়েছে তাতে এই বিলবোর্ডের সর্ব নিম্নসংখ্যা যদি ৩ হাজার ধরা হয়, তবে মোট ব্যায় হবে মাত্র ৯৪.৫ কোঁটি টাকা! বলতো কি সাঙ্ঘাতিক! কি করে মেনে নেয়া যায় এই অপচয়? কার টাকা, কার স্বার্থে কে এভাবে ওড়াচ্ছে? উত্তরটা মিলবে কি?

কমলা কোনো কথা বলে না।

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা