|

মেয়ের নির্দেশে বাবা-মাকে খুন করে বন্ধুরা

48_Police_murder_

মাত্র সতেরো বছরের একটি মেয়ে, বন্ধুদের নিয়ে পরিকল্পনা করলো, তার বাবা-মাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে। কারণ, বাবা মা মেয়েটির অনৈতিক কার্যকলাপে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটি এবং তার বন্ধুদের পরিকল্পনা সেখানেই থেমে থাকলো না। গত ১৬ আগষ্ট সত্যি সত্যি তারা খুন করলো বাবা-মাকে! বন্ধুরা যখন বাবা-মাকে হত্যা করছিলো, মেয়েটি তখন পাশে দাঁড়িয়ে সেই হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করছিলো! কী সাঙ্ঘাতিক! কী হৃদয়বিদারক! যে বাবা-মা কোলে পিঠে করে, আদর-স্নেহ দিয়ে বড় করে তুলছে সেই বাবা-মাকে হত্যা! এ কেমন সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে বেড়ে ওঠা? সেও বাবা একজন পুলিশ অফিসার! সত্যি, এ ঘটনা সিনেমার কাহিনীর বর্বরতাকেও হার মানায়। মানবতা, বিবেক স্তম্ভিত হয়ে যায়।সময়ের কথা’র পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি তৈরী করেছেন বাবাই হৃদয়

ঐশী রহমান

ঐশী রহমান

 

মেয়ের নাম ঐশী রহমান। বয়স সতেরো। বন্ধুদের হাতে খুন হওয়া বাবা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান। বয়স পঁয়তাল্লিশ। এবং তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। বয়স বিয়াল্লিশ।

হত্যাকান্ড ঘটানোর পর পালিয়ে থাকলেও পরে পুলিশের কাছে ধরা দিয়ে ঐশী স্বীকারোক্তি দেন, হত্যার নির্দেশদাতা তিনি নিজেই! হত্যাকাণ্ডে চার থেকে পাঁচজন বন্ধু অংশ নেয় বলেও পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে ঐশী। ঘটনার সময় সে পাশেই ছিল বলেও জানায়।

মা-বাবা খুন হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে পালিয়েছিল ঐশী। শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে পল্টন থানায় এসে সে নিজের পরিচয় দিয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দেয়। পরে পুলিশকে সে এ তথ্য জানায়।

পুলিশের বরাতে পত্র-পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, ঐশী মাদকাসক্ত। সে নিয়মিত ইয়াবা সেবন করে। বন্ধুদের সঙ্গে রাত কাটায়। এমনকি অনেক রাতে বন্ধুদের নিয়ে বাসায় ফিরতো। বেশ কয়েকজনের সঙ্গেই তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে সে স্বীকার করেছে। আর এ কারণে তার বাবা বিভিন্ন সময় তাকে মারধোর করতেন। তার বখাটেপনায় বাধা দিতেন। বেশ কয়েকদিন ধরে তাকে বাসা থেকেও বের হতে দেয়া হয়নি।

ঐশী পুলিশকে আরো জানান, এসব কারণে বন্ধুদের নিয়ে সে তার বাবা-মাকে খুন করে। হত্যাকাণ্ডে তার চার থেকে পাঁচ বন্ধু অংশ নেয়। ছুরিকাঘাতে মাহফুজুর রহমান ও স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে হত্যা করা হয়।

এদিকে শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপেশাদার ব্যক্তিদের ছুরির আঘাতে মাহফুজ ও তার স্ত্রী মারা গেছেন। নিহত পুলিশ কর্মকর্তার দেহে ছুরিকাঘাতের দুটি এবং তার স্ত্রীর দেহে ১১টি চিহ্ন রয়েছে।

 

ঐশী রহমান

ঐশী রহমান

 

 যেখানে, যেভাবে ঘটনাটি ঘটান ঐশী বাহিনী

শুক্রবার।১৬ আগষ্ট। সন্ধ্যায় রাজধানীর চামেলীবাগের ২ নম্বর বাসা,  বিল্ডিং-চামেলী, ৬ তলা, ফ্ল্যাট বি-৫। এটা পুলিশ অফিসার মাহফুজুর রহমানের নিজের বাসা। এ বাসা থেকে তার ও স্ত্রী স্বপ্না রহমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওইদিন এসবি ডিআইজি (পলিটিক্যাল বিট) মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া পত্রিকাকে বলেন, ‘বুধবার রাত ১১টা পর্যন্ত মাহফুজুর রহমান অফিস করেন। বৃহস্পতিবার ছুটি থাকায় তিনি আর অফিস আসেননি।’

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে মেয়ে ঐশী তার ভাই ওহী (৭) ও কাজের মেয়েকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তখন ঐশী তার ভাইকে বলে, ‘বাবা-মা বাসায় নেই চলো আমরা খালুর বাসায় যাই।’

মোশাররফ আরো জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ঐশী তার মায়ের মোবাইল থেকে তার খালুকে ফোন করে বলে, ‘আমরা বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি। কিছুক্ষণ পর আপনার বাসায় আসছি।’ কিন্তু এরপর তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ঐশীর খালু আত্মীয়স্বজনদের ফোন দেন। পরের দিন তিনি তার ভাইকে নিয়ে তাদের বাসায় চলে আসেন। এসে দেখেন ওহী বাসার নিচে ঘোরাফেরা করছে। কিন্তু বাসা তালাবদ্ধ। এ সময় ওহী তাদের জানায়, তার বোন তাকে একটি সিএনজিতে করে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে আর বলেছে, ‘তুমি বাসায় যাও, বাসার নিচে মামা আছে। আমরা পরে আসছি।’

বাসার কেয়ারটেকার শাহীনুল ইসলাম জানান, ‘ঐশীকে বাসা থেকে বের হতে দেয়া হতো না। কোথাও গেলে তার বাবা-মায়ের সঙ্গেই যেতো।’

এমনকি বাসায় তেমন কোনো আত্মীয়স্বজনেরও আসা-যাওয়া ছিল না বলে কেয়ারটেকার জানান।

তবে বাসার ম্যানেজার আমজাদ সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে ঐশী, তার ছোটভাই ওহী ও কাজের মেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। কোথায় যাচ্ছে জানতে চাইলে ঐশী ম্যানেজারকে খালুর বাসায় যাওয়ার কথা বলে।

তিনি আরও জানান, মা-বাবার অনুমতি ছাড়া ঐশীর বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল। চলতি মাসের ৪ তারিখে ভাড়া পরিশোধ করতে এসে ম্যানেজারকে এমন নির্দেশ দেন ঐশীর বাবা মাহফুজুর রহমান। বৃহস্পতিবার ঐশী বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ম্যানেজার বাধা দিলে সে তার মায়ের দোহাই দিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, মাহফুজের দুই সন্তানের মধ্যে বড় ঐশী ধানমণ্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী।

 

ঐশী রহমান

ঐশী রহমান

 

যেভাবে ‘পলাতক’ ঐশী পুলিশের কাছে ধরা দিলেন

বাবা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না বেগমকে হত্যার পর পালিয়ে থাকা ঐশী শনিবার দুপুরে নিজেই পল্টন থানায় যান বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, দুপুরে পল্টন থানায় এসে ঐশী ডিউটি অফিসারের কাছে গিয়ে তার পরিচয় দেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ওসির কক্ষে নেয়া হয়।

“ওসি এরপর তাকে নিয়ে যান কাছেই মতিঝিল জোনের উপকমিশনারের অফিসে।”

সেখান থেকে ঐশীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে। পরে তাকে নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযানে নেমেছে।

পুলিশ বলেছে, “ঐশী এখন আমাদের হেফাজতে রয়েছে।”

শুক্রবার রাজধানীর চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজ ও তার স্ত্রী স্বপ্নার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধারের পর থেকে ঐশীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

ঐশীকে খুঁজে পেলে হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা পাওয়া যাবে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা বলে আসছিলেন।

এর আগে টেলিফোনে স্বজনদের সঙ্গে ঐশীর কথাবার্তা সন্দেহজনক বলে পুলিশের কাছে মনে হয়েছে।

ঐশী থানায় এসেছেন একাই। গৃহকর্মী সুমিকেও আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাহফুজের ভাই মশিউর রহমান বাদী হয়ে শনিবার মতিঝিল থানায় মামলা করেছেন। এতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

-এ প্রতিবেদন তৈরীর সময় পর্যন্ত যা জানা গেলো, এর বাইরেও হয়তো আছে আরো কাহিনী, আরো বর্বরতা, যা এখনো আমাদের অজানা। আমরা আশা করছি,  পুলিশের কাচে ঐশীর স্বীকারোক্তিতে সামনে আরো অনেক তথ্য জানা যাবে।

 

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা