অনন্য উচ্চতায় উসাইন বোল্ট

Filed under: ফিচার,সময়ের খেলা |

111

বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পয়নশিপ, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব পুনরুদ্ধার জ্যামাইকান গতিদানবের….

জাহিদুল আলম জয়

 

মনিতেই আমুদে স্বভাবের। তাঁর  হাবভাবে মনে হয়, অসম্ভব বলে কিছু নেই! যখন যা ইচ্ছে করে তাই করে বসেন। হ্যাঁ বলা হচ্ছে উসাইন বোল্টের কথা। জ্যামাইকান এই কালো মানিক ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে যা করে চলেছেন তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। লন্ডন অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে রেকর্ড গড়ে দ্রুততম মানব হওয়ার পরই তাকে তুল্য করা হচ্ছিল অতিমানব বলে। লন্ডনেই দৌড়ের দুনিয়ায় একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে স্প্রিন্টে ডাবল জয়েরও কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। অনেকটা অলৌকিক কা-ের পর অনেকেই বোল্টকে ভিনগ্রহের মানুষের সঙ্গে তুলনা করেন। কেউ কেউ তো বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, বোল্ট রক্ত-মাংসের মানুষ কিনা! যে অবিশ্বাস্য কীর্তিগাথা জ্যামাইকান তরুণ গড়েন তাতে এমন ভাবাটা অমূলক নয়। লন্ডন অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টের পর ২০০ মিটার স্প্রিন্টেও স্বর্ণ জয়ের পর বোল্টকে নিয়ে উন্মাদনায় মজেছিল গোটা বিশ্ব।

অবিশ্বাস্য, তাক লাগানো ওই সাফল্য এক বছর পরও অব্যাহত রেখেছেন বোল্ট। এবার মস্কোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ইতিহাস গড়েছেন ২৬ বছর বয়সী জ্যামাইকান গতিতারকা। বোল্টের কাছে এমন কিছুই প্রত্যাশিত ছিল। এবার মিশন শুরু করেছিলেন পাঁচটি স্বর্ণপদক নিয়ে। ২০০৭ সালে প্রথমবার ওসাকার বিশ্বআসরে অংশ নিয়ে দুটি রৌপ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তী আসরে অর্থাৎ ২০০৯ সালে বার্লিনে ট্রেবল জয় করেছিলেন। গত আসরে ব্যর্থ হলেও এবার ফের জিতেছেন ‘ট্রেবল’। নিজেকে বর্তমান বিশ্বের ট্র্যাক এ্যান্ড ফিল্ড জগতে সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন ১০০, ২০০ ও  ৪ী১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে। এবার ১০০ মিটারে ৯.৭৭, ২০০ মিটারে ১৯.৬৬ টাইমিং গড়ে স্বর্ণজয়ের পর বোল্টের সংগ্রহশালায় যোগ হয়েছিল বিশ্ব আসরের সাতটি স্বর্ণপদক। দুই মার্কিন কিংবদন্তী স্প্রিন্টার কার্ল লুইস ও মাইকেল জনসন সর্বমোট ৮টি করে সোনা জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ ইতিহাসের সেরা দুই অ্যাথলেট। এবার ধরেই নেয়া হয়েছিল এ দু’জনকে ছুঁয়ে ফেলবেন তিনি। সেটাই বাস্তব হয়েছে শেষ পর্যন্ত। ৪ী১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে তাঁর দুরন্ত গতিবেগ আরেকটি সোনা পাইয়ে দেয় জ্যামাইকাকে। স্বর্ণ জিততে জ্যামাইকা সময় নেয় ৩৭.৩৬ সেকেন্ড। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলটি ৩৭.৬৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে রৌপ্য এবং ব্রিটেন জিতেছে ব্রোঞ্জ। এ জয়ের ফলে লুইস-জনসন এবং মার্কিন মহিলা অ্যাথলেট অ্যালিসন ফেলিক্সের সর্বাধিক আট স্বর্ণ জয়ের রেকর্ড ছুঁয়েছেন বিদ্যুৎ বোল্ট। সবমিলিয়ে বিশ্ব আসরে ১০টি পদক নিয়ে এখন পুরুষদের মধ্যে লুইস-বোল্ট সবার শীর্ষে। তবে জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত সেøাভেনিয়ার সাবেক মহিলা দৌড়বিদ মারলিন ওটির দখলে আছে সর্বাধিক ১৪টি পদক।

অবিশ্বাস্য বিদ্যুৎ গতির এ রাজাকে কে কিভাবে উপমা দিয়ে বরণ করবে, সে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় এখন খেলার দুনিয়া। বিশ্বের সর্বপ্রথম অ্যাথলেট হিসেবে টানা দুই অলিম্পিকে ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণ জয়ের অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন জ্যামাইকার গতিসম্রাট। ১০০ মিটারের ন্যায় ২০০ মিটারেও বিশ্ব রেকর্ড (১৯.১৯ সেকেন্ড) ও অলিম্পিক রেকর্ডের (১৯.৩০) মালিক বোল্টের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বদেশী অনুশীলন সতীর্থ ইয়োহান ব্লেক। বোল্টের আগে অলিম্পিকে পুরুষদের ২০০ মিটারে টানা দুবার কেউ স্বর্ণ জয় করতে পারেন নি। কার্ল লুইস (১৯৮৪-’৮৮) ও শন ক্রফোর্ড (২০০৪-’০৮) কাছাকাছি গিয়েছিলেন। তবে দুজনকেই দ্বিতীয় বার রৌপ্যপদক নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। এর মধ্যে চার বছর আগে বেইজিংয়ে ক্রফোর্ডকে থামিয়েছেন স্বয়ং বোল্ট। ১০০ মিটার জয়ের পরই সবার কাছে কিংবদন্তী হয়ে গিয়েছিলেন বোল্ট। তবে নিজেই শর্ত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘২০০ মিটার জিততে পারলেই নিজেকে কিংবদন্তী বলবো।’ সেই চ্যালেঞ্জটা ভালমতোই উতরে গিয়েছিলেন বজ্র-বিদ্যুৎ। বেইজিংয়ের পর লন্ডনেও ১০০ ও ২০০ মিটার জিতে পূর্ণ করেন স্প্রিন্ট ডাবলের ডাবল। দুই অলিম্পিকে এই দুই ইভেন্ট জয়ের কীর্তি নেই ইতিহাসে আর কারও। ২০০ মিটার স্প্রিন্টের স্বর্ণ ধরে রাখার কীর্তির স্বাক্ষীও এই প্রথম হয় অলিম্পিক।

দুই বছর আগের দুঃখ ভালমতোই ভুলতে পেরেছেন গতিদানব উসাইন বোল্ট। পুনরুদ্ধার করেছেন বিশ্বসেরার খেতাব। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে ‘ট্রেবল’ জয় করেছিলেন। কিন্তু দায়েগুতে আগের বার বিশ্ব আসরে ত্রুুটিপূর্ণ শুরুর জন্য ১০০ মিটারের ফাইনাল থেকে বাদ পড়েছিলেন। এবার ভুল করেননি। মস্কোয় বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের (এবার বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়েছে রাশিয়ার মস্কোয়, ১০ থেকে ১৮ আগস্ট)। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট ১০০ মিটার স্প্রিন্টে মাত্র ৯.৭৭ সেকেন্ড টাইমিং গড়ে দখল করেছেন বিশ্বসেরার খেতাব। সেই সঙ্গে হয়েছেন দ্রুততম মানব।
222
২০০৯ সালে বার্লিনে বিশ্ব আসরে ৯.৫৮ সেকেন্ড টাইমিং গড়ে বিশ্বরেকর্ড এবং গোটা বিশ্বে পরিচিত হয়েছিলেন ‘বিদ্যুৎ’ বোল্ট নামে। তাঁর নামের পাশে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শব্দটি বাদ থাকলে কি চলে? স্বদেশী ইয়োহান ব্লেকের কাছ থেকে সেই হারানো খেতাবটি আবার পুনরুদ্ধার করেছেন ২৬ বছর বয়সী এ জ্যামাইকান। সেজন্য একেবারে বিদ্যুৎ বেগেই দৌড়েছেন, ১০০ মিটারে মৌসুমের সেরা টাইমিং গড়ে জিতেছেন স্বর্ণ। ৯.৮৫ সেকেন্ড টাইমিং গড়ে রৌপ্য জেতেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিন গ্যাটলিন। আর ৯.৯৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে ব্রোঞ্জ জেতেন আরেক জ্যামাইকান নেস্তা কার্টার।

২০১১ বিশ্বসেরার প্রতিদ্বন্দ্বীতায় গোড়ায় গলদ করে বাদ পড়তে হয়েছিল আগের আসরে বিশ্বরেকর্ড গড়া জ্যামাইকান স্প্রিন্টার বোল্টকে। বোল্টবিহীন ১০০ মিটারে আরেক জ্যামাইকান ২১ বছর বয়সী ব্লেক ৯.৯২ সেকেন্ড সময় নিয়ে জিতে নিয়েছিলেন স্বর্ণ। হয়ে যান এই ইভেন্টের সর্বকণিষ্ঠ স্বর্ণজয়ী স্প্রিন্টার। কিন্তু ২০০৯ সালে বার্লিনে বোল্টের গড়া (৯.৫৮) রেকর্ডের তুলনায় ব্লেক সময় বেশি নেন ০.৩৪ সেকেন্ড বেশি। এবারও বিরূপ প্রকৃতির মধ্যে ফলাফল খারাপ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কারণ বৃষ্টির দরুণ লুঝনিকি স্টেডিয়াম ছিল ভারী। বোল্ট কেন অন্য অ্যাথলেটরাও ঠিকমতো দৌড়াতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে তৈরি হয়েছিল সংশয়। কিন্তু শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ১০০ মিটারে আবারও বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় পরেন বিদ্যুৎ বোল্ট। মৌসুম সেরা টাইমিংয়ে এবারসহ চতুর্থ ব্যক্তিগত বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের স্বর্ণ বাজিমাত করেন বোল্ট।

চিরচেনা হলুদ-কালোর মিশ্রণে তৈরি জ্যামাইকান জার্সি আর কালো-সবুজের মিশেলে তৈরি হাফপ্যান্টে ছয় নম্বর লেনে অবস্থান নিয়েছিলেন বোল্ট। বাকি সাত লেনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় গ্যাটলিন ছাড়া আহামরি আর কেউ ছিলেন না বোল্টের গতির বিবেচনায়। ১০০ মিটারে দুইবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন গ্যাটলিন। কারণ, আগেই ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে বোল্টের জন্য অন্যতম হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের টাইসন গে এবং স্বদেশী আসাফা পাওয়েল বিশ্ব আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তাছাড়া সর্বশেষ সেরা টাইমিং গড়া গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্লেক ইনজুরির কারণে অংশ নিতে পারেননি। গত বছর আগস্টে ডায়মন্ড লীগ মিটে ৯.৬৯ সেকেন্ডে শেষ করে সর্বকালের দ্বিতীয় সেরা টাইমিং গড়েছিলেন এ জ্যামাইকান। তিনিও না থাকায় বোল্টের জন্য খেতাব পুনরুদ্ধার আরও সহজ হয়ে যায়। অবশ্য গ্যাটলিন ভাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এগিয়েও ছিলেন ছিলেন। কিন্তু হঠাৎই ক্ষিপ্রতা বেড়ে যায় বোল্টের। শেষ মুহুর্তে টপকে যান গ্যাটলিনকে। এই ইভেন্টে আধিপত্য দেখিয়ে জিতলেও বোল্ট তার সর্বোচ্চ পারফরমেন্স দেখাতে পারেননি। জয়ের পর তিনি বলেন, ‘আমি খুশি কিন্তু আরও ভাল করতে চেয়েছিলাম। সেমিফাইনালের পর আমার পা একটু ব্যথা করছিল। জানি না কেন। বিশ্ব রেকর্ড গড়ার চিন্তা ছিল না, তাই শুধু জিতেই সন্তুষ্ট। কারণ জ্যামাইকার মানুষ আমার কাছ থেকে এর কম কিছু প্রত্যাশা করেন না। তাঁরা সবসময়ই চান আমি যেন আধিপত্য বিস্তার করি।’

বোল্টের অতিমানবীয় কীর্তিগাথার পর ক্রীড়াবিশ্বে তাকে নিয়ে চলছে বন্দনাগীতি। বিশ্বের সব প্রান্তেই জয়গান হচ্ছে বোল্টের। প্রায় সব দেশের মিডিয়াই শীর্ষ সংবাদ হিসেবে প্রচার করছে বোল্টের বিশ্বরেকর্ড। পাশে থেকে বোল্টের বিশ্বজয় দেখা প্রতিদ্বন্দ্বীরাও তাঁকে ভাসিয়েছেন প্রশংসার বাণে। ২০০ ও ১০০ মিটারের সব প্রতিপক্ষই বোল্টকে অভিনন্দনে সিক্ত করেছেন। আর বোল্টের দেশ জ্যামাইকায় যেন ঈদ উৎসব (!) চলছে। দেশটির পথে-প্রান্তরে, অলি-গলিতে, সর্বখানে চলছে আনন্দ উৎসব। সোনার ছেলের গৌরবময় কীর্তিগাথায় বার্তা দিয়েছে জ্যামাইকান সরকারও। দেশে ফিরলে যে বোল্ট ভালবাসার গণজোয়ারে সিক্ত হবেন তা সহজেই অনুমেয়।

 

** বোল্টের কীর্তিগাথা

* তিনবার ২০০ মিটার স্প্রিন্ট জয়ী প্রথম অ্যাথলেট উসাইন বোল্ট। দুইবার করে জিতেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল জনসন ও ক্যালভিন স্মিথ

* দুইবার ১০০ ও ২০০ মিটারের ‘ডাবল’ জয়ের একমাত্র কীর্তি

* ৫টি ব্যক্তিগত স্বর্ণ জিতে বোল্ট স্পর্শ করেছেন কার্ল লুইস ও কেনেনিসা বেকেলেকে। মাইকেল জনসন ও সের্গেই বুবকা অবশ্য এগিয়ে। এ দু’জন জিতেছেন ৬টি করে ব্যক্তিগত স্বর্ণপদক।

* ৮টি স্বর্ণ জয়ের বিরল রেকর্ড। এই রেকর্ডে বোল্টের সঙ্গী কার্ল লুইস ও মাইকেল জনসন। কার্ল লুইস তিনটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে জিতেছিলেন ৮টি স্বর্ণ। মাইকেল জনসনকে ৮টি স্বর্ণ জিততে খেলতে হয়েছিল ৫টি আসর। মস্কোতে ৩টি স্বর্ণ জিতে উসাইন বোল্ট র্স্প করেছেন এই দুজনকে। মেয়েদের মধ্যে অবশ্য ৮টি স্বর্ণ আছে মার্কিন স্প্রিন্টার অ্যালিসন ফেলিক্সের।

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।