|

কে সাধারণ আর কে অসাধারণ?

SONY DSC

 

সা ধারণ এবং অসাধারণ। কে সাধারণ আর কে অসাধারণ? প্রশ্নটা যখন আমাদের সামনে আসে তখন আমরা এর উত্তর খুঁজে ফিরি মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্য, আচার-আচরণ, মন-মানসিকতা, আবেগ-বিবেক, রুচিবোধ, বিশেষ যোগ্যতা ইত্যাদির আলোকে। আমার আজকের আলোচ্য বিষয়, নারী চরিত্র।

 

আমার দৃষ্টিতে সাধারণ মেয়েদের রুচিবোধ প্রায়ই দেশজ। মানুষ মাত্রই স্বপ্নবিলাসী; এরাও এ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তবে এরা স্বপ্নবিলাসী হলেও কৃত্রিম জীবন-যাপনকে ভালোবাসে না। এরা অল্পতেই অনেক সুখী। সেও যদি না পায়, তারপরও প্রতিবাদ করে না। দুঃখ পেলে কাঁদে, এবং সেই কান্না একান্তই গোপন এবং সংযত।

 

এ কথা সকলেই স্বীকার করে থাকেন যে, আধুনিক কালে অন্তর্নিহিত মানব চরিত্রের একটা বাহিৃক রূপের প্রকাশ ঘটে তার পোশাকের মাধ্যমে। এই প্রবাস জীবনে, আমি একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করে আসছি, আর তা হলো, যেসব নারী দেশীয় পোশাকে অভ্যস্থ অনেক পুরুষের চোখে তারা ‘সাধারণ’। পুরুষের সে দৃষ্টিভঙ্গি আমি মেনে নিতে পারি না। কেননা, এমন অনেক নারী আছেন যারা দীর্ঘদিন যাবৎ বিদেশে বসবাস করছেন এবং পরিধান করছেন দেশীয় পোশাক, তারা কি সাধারণ? আর যারা সব সময়ই বিদেশী পোশাকের ওপর নির্ভর করে থাকেন তারা কি অসাধারণ? অবশ্য অনেক নারী-পুরুষ তেমনটিই মনে করে থাকেন। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। অসাধারনত্বের প্রধান শর্ত কোনোভাবেই শুধুমাত্র পোশাক হতে পারে না।

 

একজন মানুষের নিজস্ব সার্বিক গুণাবলীর মধ্য দিয়েই মূলত: নিরুপিত হয় তিনি সাধারণ, নাকি অসাধারণ।

 

প্যান্ট, শার্ট বা বিদেশিনীদের পোশাক পরিধান করেই কোনো নারী যদি নিজেকে ভাবেন, ‘তিনি অসাধারণ’ তবে সেটা রীতিমতো হাস্যকর।

 

কানাডায় আমার প্রবাস জীবন প্রায় আঠারো বছর অতিক্রান্ত হলো, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনোভাবেই নিজেকে একজন বিদেশিনীর মতো করে ভাবতে পারি না। সে ইচ্ছেটাও রাখি না। এই কানাডায় আমার মতো মানসিকতা সম্পন্ন নারীর সংখ্যা নেহায়েৎই কম নয়।

 

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই প্রবাস জীবনে পেশাগত কারণে, আবহাওয়া বা অন্যান্য সামাজিক কারণে আমাদের পরিধান করতে হয় নির্বাচিত পোশাক-আশাক। এ দেশের কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শার্ট-প্যান্টই হচ্ছে প্রধান পোশাক। যাকে আমরা বিদেশী পোশাক বলে থাকি। আর এই শার্ট-প্যান্ট পরলেই কেউ যদি ভাবেন, তিনি বিদেশিনী হয়ে গেছেন, এবং একই সাথে যদি তার চাল-চলন আচার-ব্যবহারেও চলে আসে বিদেশী কালচারের অনুকরণ সেটা কি ঠিক? মোটেই না।

 

আমরা কর্মক্ষেত্রে শার্ট-প্যান্ট পরিধান করে থাকি। বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে নির্বাচিত পোশাক পরে থাকি, তাই বলে নিজেকে কখোনোই ‘বিদেশিনী’ ভাবিনি, ভাবতে পারিনি। ভাবার ইচ্ছেও রাখি না।

 

ব্যাক্তি চরিত্রের অসাধারনত্ব নির্ভরশীল তার ব্যাক্তিত্বের ওপর। আর ব্যাক্তিত্ব সুপ্রতিষ্টিত হয় অনেক কিছুর ওপর। বলাবাহুল্য এর মধ্যে পোশাক হচ্ছে একটি অন্যতম প্রধান উপাদান। আর সব ক্ষেত্রে সব ধরণের পোশাকও মানানসই নয়। কেননা, সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত মার্জিত ও রুচিবোধের ব্যাপারটি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বেমানান পোশাক অবশ্যই ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। আর সে কারণেই আচার-অনুষ্টানের ধরণ-ধারণ বুঝেই পোশাক নির্বাচন করে থাকেন সচেতন নারীরা।

 

আমি যদি কোনো অনুষ্টানে যাই, তবে প্রথমেই জেনে নেবো অনুষ্টানটির ধরণ। এরপর জানবো, কোন সময় তা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সে সময় আবহাওয়া কেমন থাকবে ইত্যাদি। তবে সবার ওপরে প্রাধান্য দেবো নিজের বয়সকে। কেননা পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বয়স একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমার বয়সের সাথে ম্যাচ করেই আমাকে নির্বাচন করতে হবে আমার পোশাক।

 

ধরুন আপনার বয়স চল্লিশ, কিন্তু আপনি পরলেন, টিন-এজদের পোশাক, সেটা কি মানানসই হবে? মোটেই না। বরং সেটা হবে হাস্যকর। আমরা প্রায়ই দেখে থাকি, এমন অনেক বাঙ্গালী নারী আছেন যারা বাঙ্গালী কমিউনিটির অনুষ্ঠানে বিদেশিনীর বেশ-ভুষা নিয়ে হাজির হন। এবং আচার-আচরণে এমন ভাব প্রদর্শন করতে থাকেন যে, ‘তিনি একজন ‘অসাধারণ’ নারী! ব্যাপারটি সত্যিই হাস্যকর।

 

আসল কথা হচ্ছে, যে রমনী রাঁধেন ইলিশ তাকে বাঙ্গালী পোশাকেই অন্তত বাঙ্গালীদের চোখে সুন্দর দেখায়। অসাধারণ যদি বলতেই হয়, তবে আমি তাকেই বলবো। কেননা, সে এই প্রবাসে এসেও নিজের শেঁকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। স্বীয় কৃষ্টি-কালচারের প্রতি তার রয়েছে একটা বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ। আবার বিদেশীদের অনুষ্ঠানে গেলে তার পোশাক হতে পারে ভীন্ন; তবে অবশ্যই তা মার্জিত হতে হবে। কেননা মার্জিত পোশাকের মাধ্যমেই প্রকাশ ঘটে ব্যক্তির ব্যাক্তিত্ব।

 

অন্যদিকে অনুষ্টানটি যদি দিনে হয় তবে পোশাকের রঙ হতে হবে হালকা, আর যদি রাতে হয় তবে তা হবে গাঢ়। দিনে গাঢ়, রাতে হালকা একেবারেই বেমানান হবে। আবার সাজ-সজ্জার ক্ষেত্রে আবহাওয়াকেও দিতে হবে গুরুত্ব, কেননা শুস্ক আবহাওয়ার সাজ-সজ্জা আর আর্দ্র আবহাওয়ার সাজ-সজ্জা এক হবে না।

 

পরিশেষে আবার আসি সেই সাধারণ আর অসাধারণ প্রসঙ্গে। একজন বাবার কাছে তার মেয়ে সব সমই অসাধারণ, আবার একজন সন্তানের কাছে তার মা; বা একজন ভাইয়ের কাছে তার বোন অসাধারণ, সেটা হতেই পারে, কেননা সেটা ব্যক্তির একক নির্বাচন। তবে সামগ্রিক বিচারে অসাধারণ চরিত্রের থাকতে হবে অনেক গুণাবলী, যেমন, শিক্ষা-দীক্ষা, নিজের বাহিৃক উপস্থাপন, কথা বলার ধরণ, মন-মানসিকতা, আচার-আচরণ, মেধা-মনন  ইত্যাদি। আর এই সব গুণাবলী প্রকাশের মধ্য দিয়েই ব্যাক্তির অসাধারনত্বকে চিহিৃত করে থাকে মানুষ বা সমাজ।

 

 

 

 

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা