ফেসবুকে ফজিলা

Filed under: চয়ন আরার খোলা বয়ান |

চয়ন

 ই বেলা কইবার চাইছিলাম তো অনেক কথা, কিন্তু যখনই কলমডা লইয়া বইলাম, মাথাডা কেমুন গুলাইয়া গেলো!

কারে লাইয়া লিখমু, কি লিখমু, আউলাইয়্যা গেলো বেকাক কিছু। কাঁচা গোবরের লাহান। কোন বিষয় লাইয়া লিখমু কন, যেইডাই ভাবি, হেইডাম মইধ্যেই পাই দুর্গন্ধ! অনেক চিন্তা-ভাবনা কইরা ডিসিশান লইলাম, আমাগো কামের মাইয়া ফজিলা আর অর ফেসবুক এক্টিভিটিজ লইয়াই লিখমু।

প্রথমেই বরে নেই, ফেসবুকে আমার একটা একাউন্ট আছে। তবে সেটা আমার নামে নয়। নাম এবং ছবি দুইটাই নকল। কেন? কারণ আছে, আমার লাহান অতি সুন্দরী নারীর আসল ছবিখান ফেসবুকে দেয়া মাত্রই ফেসবুকার রোমিওগো ফালাফালি শুরু হইয়া যাইবো! কার আগে কে ফ্রেন্ড হইবো তা লইয়া তুলকালাম কান্ড শুরু হইয়া যাইবো। হাজারে হাজারে  আইবো ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট। এর মইধ্যে থাকবো বিশতলার রোমিও থাইক্যা শুরু কইরা গাছতলার রোমিও। হাভাইত্যা, আবাইল্যা, হ্যাবলা-ভ্যাবলা, গলদা, বলদা বেবাকেই থাকবো। আর কোনো মতে যদি সেই রোমিও পাল আমার ঠিকানাডা একবার হাসিল করবার পারে তো কথাই নাই, সটান আমার বাড়ির সামনে পইড়া যাইবো মাইলকে মাইল লম্বা লাইন। ঐ বেহুদাগো তখন কেডায় সামরাইবো কন?চয়ন আরা -৫ ইলাস্ট্রেশন

আপনাদের কানে কানে চুপি চুপি একটা কথা বলি, ফেসবুকে আমি অহন যে নামডা ব্যবহার কইরা নিজের নামে চালাইবার লাগসি, হেইযা আসলে আমাদের বাসার কাজের মেয়ে ফজিলার নাম। ফেসবুকে ব্যবহৃত ছবিটাও কিন্তু ফজিলারই। ফজিলা অত্তো সুন্দরী না। গরীব ঘরের মেয়ে কতোটাই বা সুন্দর হবে। তবে হ্যাঁ নাকটা খাড়া বলেই ফেসকাটিংটা মাশাল্লা ধরণের সুন্দর। হাস্যকর কথাডা কি জানেন, ফজিলার ঔ মাশাল্লা সুন্দর ধরণের ছবিখান দেইখ্যাই অন্তর জ্বইল্ল্যা উঠলো ফেসবুক রোমিও গো। জানেন, ফজিলার এখন ফ্রেন্ড সংখ্যা কতো? টাশকি খাইবেন, ছয় হাজার। তার মধ্যে পুরুষ পোলাগো সংখ্যা পাঁচ হাজার সাতশ’। আমি ভাবি, এই সব ভাদাইম্যাগো আর কোনো কাম নাই! মাইয়া মানুষ দেখলেই বুঝি এগো মাথায় কামনার পোকা লাফায়! বাছ-বিচারের বালাই নেই।

এবার আপনাদের বলবো আরো অবাক করা একটা কথা। শুনলে ভদ্রজনেরা ভিমড়িও খাইবার পারেন। অনেক চিন্তা-ভাবনা কইরা সেদিন ফজিলাকে কাছে ডেকে বললাম, ‘এই তুই ফেসবুকের নাম শুনেছিস?

ফজিলা একহাল হেসে বললো,’হায় আল্লাহ, আফায় এইডা কি কন, ফসেবুকের নাম জানেনা এমুন শিক্ষিত মানুষ কি এই জগতে আছে নাকি। আমি ফাইব কেলাশ পাশ করা একজন শিক্ষিত মাইয়া, আর আমি জানমু না!’

আমি ফজিলার কথা শুনে হাসলামও না, কাঁদলামও না। কেনোনা ও আমাদের বাসায় আছে আজ বারো বছর যাবৎ, ওর চারিত্রিকে সব বৈশিষ্ট্যই আমাদের জানা। বয়স এখন বাইশ। বিয়ার জন্য মাঝে মাঝেই উতলা হইয়া যায়। ধমক দিয়া চাপাইয়া রাখছি। বড় চাচা বলেছেন, ভালো একটা ছেলে দেখে আগামী বছর ওর বিয়ার পিয়াস মেটাবেন।

সে যা হোক যা বলছিলাম, ফেসবুক প্রসঙ্গে আলাপকারে ফজিলা আমাকে এমন একখান কথা শোনাইলো যা শুনে আমিই টাশকি খাইলাম। ও বললো, ফেসবুকে আমারো একখান একাউন্ড আছে আফা। কমলা আফা বানাইয়া দিছে, নাম দিছে ফজিলাতুন কোবড়া। কি কমু আফা,ম্যালা ফ্রেন্ড হইছে! কমলা আফায় কইছে তিন হাজার; তয় নিত্যদিনই নাকি বাড়তাছে। কনতো দেহি আফা এত্তোগুলা ফেরেন্ড দিয়া আমি কি করমু! আমার তো একখান দরকার।

ফজিলার কথা শুনে আমি নির্বাক।

ফজিলা লাজভরা হাসি হেসে বললো, মনে লয় আফা একখান গাড়ি-বাড়িওয়ালা ম্যানেজ হইয়া যাইবো। কমলা আফায় কইছে, আমার হইয়া হেয় গুটি খেলবো।

আমি ফজিলাকে একটা ধমক দিয়ে বললাম, ওসব বাজে চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।

ফজিলা মুখটা পেঁচার মতো করে বললো, আফনেরা বড়লোক মানুষ, আমাগো লাহান গরীব মাইনষের য ভালো চাইবেন না হেইডা তো জানি।

আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, ফেসবুকে বন্ধুত্ব হলেই বিয়ে হবে এটা ভাবিস না।  তোর আসল পরিচয় জানলে বল কোন গাড়িওয়ালা-বাড়িওয়ালা তোকে বিয়ে করবে।

এমন সময় কমলা এরো সেখানে। আমি ওকে ধমক দিয়ে বললাম, ফজিলাকে নিয়ে এ কোন খেলা তুই খেলতে শুরু করেছিস!

কমলা হেসে বললো, সে এক মজার খেলা।

আমি কন্ঠটাকে আরো চড়া করে বললাম, তোর  জন্য মজার খেলা, কিন্তু ফজিলার জন্য তা গলার ফাঁস। মনে কর তোর তালে পড়ে এক বড়লোকের ছেলেকে পছন্দ করে বসলো মেয়েটি, তোর মাধ্যমে চালিয়ে গেলো প্রেম, পরে সেই ছেলে যদি ওর প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে তবে বল ওর জীবনটাই কি নষ্ট হয়ে যাবে না?

কমলা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না। শুধু বললো, ভুল হয়ে গেছে আপু। তোমার মতো করে ভাবিনি। আমি তো ওকে একটা করে ছেলের ছবি দেখাতাম আর বলতাম, দেখ কাকে পছন্দ হয়। জানো ও পছন্দ করে বসলো, আমাদের দেশের এক মিনিষ্টারের ছেলেকে। নাম টুটুল। পড়াশোনা করছে আমেরিকায়। ফেসবুকে আমাদের ফজিলার ছবি দেখে সে তো পাগল!

আমি তিক্ত কন্ঠে বললাম, ছাগলে তো পাগল হবেই। আমাদের দেশের মন্ত্রী-মিনিষ্টারের কি আর কোনো টেষ্ট আছে! তাদের ছেলেমেয়েদেরই বা থাকবে কি! যত্তোসব জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দল হয়েছে এ দেশের মন্ত্রী-মিনিষ্টার। ছেলেমেয়েগুলোও তেমনই।

কমলা বললো, আমি আর ওর হয়ে কিছু করবো না আপু। ওর একাউন্টটা আজই ক্লোজ করে দেবো।

কমলার কথা শুনে ফজিলা মুখ কালো করে বলরো, গরীবের ভালো তো কেউই চায়না আফা। আফনেরা যাই কন, টুটুলরে আমার পছন্দ হইছে, হেয়ও আমারে পছন্দ করছে, আমি যেমতে পারি হেরেই বিয়া করমু। দরকার হইলে হের মা-বাপের কাছে যামু। কমু, আমি টুটুলের পছন্দের মাইয়া….এই আমি কইয়া রাখলাম। কথাগুলো বলে ও হন হন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

আমি চেপে গেলাম, আমার করা নকল নামে ফজিলার একাউন্টটার কথা। উল্টো কমলাকে বললাম, এবার সর্বনাশের পথ থেকে ফজিলাকে ফিরিয়ে আনাটাও তোরই দায়িত্ব।

কমলা অপরাধির কন্ঠে বললো, ঠিক বলেছো আপু। অপরাধ আমার। আমি অবশ্যই সে চেষ্টাই করবো।

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।