|

বিতর্কিত পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ

 পারমাণবিক

সম্ভাবনা নাকি সমস্যা?

বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বয়স খুব বেশি দিন হয়নি। তবে আজ থেকে ৫২ বছর আগে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে নানান সমস্যায় আক্রান্ত এ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রায় সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার দু’টি উৎপাদন ইউনিট নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে প্রবেশের পথে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু অর্থ, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পারমাণবিক চুল্লি বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের কথা চিন্তা করে অনেকেই এ প্রকল্প বন্ধ করার দাবি তুলেছেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভালো মন্দ নিয়েই এই বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন  এম. মিজানুর রহমান সোহেল

আগামী ২ অক্টোবর উদ্বোধন হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
আগামী ২ অক্টোবর রূপপুরে এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে ২০২১ সালে পরমাণু থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। অধিকতর পরিবেশবান্ধব পরমাণুপ্রযুক্তির মাধ্যমে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হবে। তিনটি চুক্তির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করবে রাশিয়ান ফেডারেশনের এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ তথ্য জানিয়েছেন।

১৫ বছরের মধ্যেই খরচ উঠে আসবে
বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে রূপপুরে ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট সংবলিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক কাজগুলো সম্পাদনের জন্য সরকার গত ১৫ জানুয়ারি রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশ হিসেবে মূল নির্মাণকাজের অর্থ জোগানের লক্ষ্যে ওই দিনই একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির এই টাকা প্রকল্পের সাইট টেস্ট, সাইট ডেভেলপমেন্ট এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় হবে। প্রায় ২ শতাংশ হারে সুদসহ ২৮ বছরে এ অর্থ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটিতে রাশিয়া বিনিয়োগ করবে ৯০ শতাংশ এবং বাকি ১০ শতাংশ দেশীয় অর্থায়নে হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচ বেশি হলেও চালু হওয়ার ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সেই খরচ তুলে আনা সম্ভব।

২০২০ সালে রি-অ্যাক্টর স্থাপন, মেয়াদ ৬০ বছর
সম্প্রতি পাবনা সার্কিট হাউজে সাংবাদিক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রকল্প বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ ও ডিজাইনিংয়ের কাজ ২০১৪ সালের মধ্যে শেষ হবে। রি-অ্যাক্টর স্থাপনের কাজ শুরু হবে ২০১৫ সালে। ২০২০ সাল নাগাদ রি-অ্যাক্টর স্থাপনের কাজ শেষ হবে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ হবে ৬০ বছর। পরে আরো ২০ বছর তা বাড়ানো যাবে। কেন্দ্রটি চালাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। ব্যবহৃত জ্বালানি তারাই ফেরত নিয়ে যাবে।

Ruppur-640[1]একনেকের ৫ হাজার ৮৭ কোটি টাকা অনুমোদন
প্রাথমিক কাজ সম্পাদনের জন্য গত ২ এপ্রিল অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাঁচ হাজার ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন (প্রথম পর্যায়) নামের প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। প্রথম চুক্তির আওতাভুক্ত জরিপকাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় চুক্তির অধীনে শিগগিরই প্রকৌশল জরিপ, রিঅ্যাক্টর ড্রইং, ডিজাইন ইত্যাদি শুরু করা হবে। আগামী অক্টোবরের মধ্যেই দ্বিতীয় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। আগামী বছরের প্রথম দিকে রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে মূল নির্মাণকাজ শুরু ও অর্থায়নের জন্য একটি জেনারেল কন্ট্রাক্ট ও মূল অর্থচুক্তি স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার প্রক্রিয়া সরকার শুরু করেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রস্তাবিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলাকাটি সুনামি, ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। যেকোনো মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে স্বাভাবিকভাবে পরিচালনায় সক্ষম প্রযুক্তি ব্যবহার ও সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী রূপপুর প্রকল্পে তৃতীয় প্রজন্মের পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হবে। রাশিয়ান ফেডারেশন দীর্ঘমেয়াদী চুল্লির প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করবে এবং ব্যবহৃত বর্জ্য ফেরত নেবে বলে জানা গেছে।

১৯৬১ সালের উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয় ১৯৭১ সালে
পাবনা জেলায় অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পাধীন একটি সরকারী উদ্যোগ। বিদ্যুতের চাহিদা সরবরাহ নিশ্চিত পরিকল্পনায় ১৯৬১ সালে পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সহায়ক প্রকল্পের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কর্মকর্তাদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণসহ অত্যাধুনিক বাসস্থান গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের পরেই অর্থের অভাবে পরিত্যক্ত হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।

চার যুগে শুধুই ব্যর্থতা
স্বাধীনতার পর ১৯৭৮-৭৯ সালে একটি সম্ভাব্যতা জরিপ করা হয়। জরিপে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য যথার্থ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৯৮০ সালে একনেক ১২৫ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অনুমোদন করে; কিন্তু অর্থায়নসহ অন্যান্য সমস্যায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে এ প্রকল্পের একটি ফলোআপ স্টাডি করা হয়। এ স্টাডিতেও প্রকল্পটি কারিগরি এবং আর্থিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়। গত বিএনপি ও চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শেষপর্যায়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয় বলে বর্তমান সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান জানান। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রকল্পটি নিয়ে রাশিয়ার সাথে যোগাযোগ শুরু করে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমিRuppur-05[1]
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে পাবনার রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে মূল প্রকল্পের জন্য ১৯৬১ সালে ২৬০ একর এবং পদ্মা নদীর পাড় থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্বদিয়ার শাহপুর মৌজায় ৩৩.৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পরে ১৯৬৬-৬৭ সালে ৩৩.৫৫ একর জমির ওপর আবাসিক ভবন সাইট অফিস, রেস্ট হাউজ, রাস্তা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, পাম্প হাউজ ইত্যাদি, নির্মাণ করা হয়। আর মূল প্রকল্পের ২৬০ একর জমি দীর্ঘ ৫১ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

২০০৮ সাল থেকে আলোর মুখে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
ঈশ্বরদী থানার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৬১ সালে। সেজন্য ২৬০ একর জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রকল্পটি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। ২০১১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া সরকারের সহায়তায় রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট স্থাপন করা হবে। প্রতিটি ইউনিট এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া পারমাণবিক চুল্লির আজীবন জ্বালানি সরবরাহ করবে ও বর্জ্য বা স্পেন্ট ফুয়েল সেদেশে নিয়ে যাবে। এছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবল তৈরিতেও রাশিয়া প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও দেশটি সহায়তা দেবে। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ৫ বছর মেয়াদী ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট অন কো-অপারেশন ইন দ্য ফিল্ড অব দ্য ইউজ অব নিউক্লিয়ার পাওয়ার ফর পিসফুল পারপাজেস শীর্ষক চুক্তি অনুসারে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে রাশিয়া
অর্ধশতাব্দী ধরে অপোর পর রাশিয়ার সহায়তায় জেনারেশন থ্রি প্লাস সংবলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে রাশিয়ার সাথে ৫০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি সম্পন্ন এবং চুক্তি অনুযায়ী ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ২ টাকার বেশি হবে না বলে জানা গেছে।

পানির মাধ্যমে পারমাণবিক চুল্লিটি ঠাণ্ডা রাখা হবে
রাশিয়ার সাথে চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনভাবে নির্মাণ করা হবে যাতে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামি এক সাথে আঘাত করলেও তা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ২০১১ সালে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত জাপানের ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তেজস্ক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনভাবে তৈরি হবে যাতে তেজস্ক্রিয়া ছড়াতে না পারে। পানির মাধ্যমে পারমাণবিক চুল্লিটি ঠাণ্ডা রাখা হবে। কোনো কারণে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠাণ্ডা বাতাসের মাধ্যমে কেন্দ্রটির তাপ কমানো হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে বিমান আছড়ে পড়লেও কোন ক্ষতি হবে না।

প্রকল্পে ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে Ruppur-04[1]
চুক্তি অনুযায়ী প্রথমপর্যায়ে সমীক্ষার কাজ শেষে দ্বিতীয়পর্যায়ে মূল কাজ শুরু হলে প্রতিদিন এখানে প্রায় আট হাজার মানুষ কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে একটি মাস্টার প্লান করা হচ্ছে, যা ২০১৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে জনমনে শঙ্কা দূর করতে চলতি বছরেই ঢাকা ও পাবনার রূপপুরের তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব হবে: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ড. ইয়াফেস ওসমান জোর দিয়ে বলেছেন,পরে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে এ প্রকল্প অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, সবচেয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় পরমাণু শক্তি থেকেই। আর এটি তুলনামূলক পরিবেশবান্ধবও। কারণ এক গ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, অন্য কেন্দ্রে তা উৎপাদন করতে তিন টন কয়লা বা ২.৬ টন অন্য কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াতে হয়। তিনি জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকার ঝুঁকি প্রশমনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

যে কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করা জরুরি
ফেসবুকে “রূপপুর পারমানবিক চুক্তির প্রতিবাদে মানব বন্ধন” নামের একটি ইভেন্ট পেজ গত ২০১১ সাল থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আসছে। একই সাথে পরিবেশ রক্ষা বেশ কয়েকটি সংগঠন এ প্রকল্পটি বন্ধ করার জন্য স্মারকলিপি, মানব বন্ধন, পোস্টার-লিফলেট বিলি, মাইকিং ইত্যাদি করে আসছে। নিম্নে তাদের দাবির বিস্তারিত জানানো হলো।

বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে এ রকম একটি প্রকল্পই যথেষ্ট
২০১১ সালের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ জাতির জন্য সম্মানের বিষয়। একই সময়ে বিজ্ঞান ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকলেও রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র রিখটার স্কেলে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার মতো করে তৈরি করা হবে। এ সম্পর্কে কোনো ধরনের গবেষণা হয়েছে কিনা বা কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এ তথ্য দিয়েছেন সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি। স্বভাবতই ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান সময়ে বিতর্ক হওয়ার আগে পারমাণবিক বর্জ্য, আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছিল। বিতর্ক চলছিল অন্যান্য পন্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি ব্যয় করে এই পরমাণু বিদ্যুৎ স্থাপনার লাভ-ক্ষতি, মাত্রাতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়, পরমাণু বর্জ্য অপসারণ, স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের কথা অগ্রাহ্য করছে, যা শুধু বর্তমান নয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও চরম হুমকিস্বরূপ। অতীত ইতিহাস ও বর্তমান দেখলে আমরা যে ভয়াবহ চিত্র পাই তাতে বাংলাদেশকে ধ্বংসের জন্য এ রকম একটি প্রকল্পই যথেষ্ট।

বিভিন্ন দেশ বন্ধ করে দিচ্ছে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র
জার্মানি, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে, বন্ধ করে দিয়েছে নতুন কেন্দ্র স্থাপন। রাশিয়ার চেরোনোবিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার থ্রি-মাইল আইল্যান্ড ও সাম্প্রতিক জাপানের ফুকুশিমাসহ বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চরম ভয় ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ও নির্মাণ কাজ চলছে এমন কেন্দ্রও বন্ধ করার জন্য সেসব দেশের সাধারণ জনগণ আন্দোলন করছেন। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আন্দোলন চলছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

ইউরেনিয়াম সংকটে পৃথিবী!
পৃথিবীতে ইউরেনিয়ামের পরিমাণও স্বল্প। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, হাই গ্রেড ইউরেনিয়ামের মজুদ আছে প্রায় ৩৫ লাখ টন। বর্তমানে প্রতি বছর ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ৬৭ হাজার টন। এই হারে ব্যবহার হলে বর্তমান মজুদ ৫০ বছরের মধ্যে শেষ হবে। আর যদি পৃথিবীর বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় সবটাই যোগাতে হতো পরমাণু বিদ্যুৎকে তবে তা দিয়ে চলত মাত্র ৯ বছর। হাই গ্রেড-লো গ্রেড মিলিয়ে এই মুহূর্তে ইউরেনিয়ামের মোট মজুদ প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টন যার বেশিরভাগ থেকেই ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। অনেক খনি আবার ইতোমধ্যে পরিত্যক্তও হয়ে গেছে।

পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি
ইউরেনিয়াম মাইনিং, পরমাণু রিঅ্যাক্টর নির্মাণ, টাওয়ার শীতলীকরণ, পরমাণু বর্জ্যের পরিবহন ইত্যাদি বিষয়গুলো আমলে নিলে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বায়ুমন্ডল, পরিবেশ ও প্রাণীর ক্ষতি করে- সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই। ১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকলে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে Clean Development provision থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। জন উইলিয়াম এবং ফিলিপ স্মিথ ২০০৪-এর এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, একটি আধুনিক প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করে তিন ভাগের এক ভাগ। তাছাড়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে কয়েক হাজার গুণ ক্ষতিকর সিএফসি অর্থাৎ ক্লোরোফ্লোরোকার্বন নিঃসরিত হয় যাকে ‘মনট্রিল প্রটোকলে’ পরিবেশ দূষণের দায়ে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও পরমাণু রিঅ্যাক্টর প্রতি বছর বায়ুমন্ডলে ও পানিতে প্রায় মিলিয়ন কুরি (তেজস্ক্রিয়তার একক) তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ছড়ায়। এসব আইসোটোপের তালিকায় আছে ক্রিপ্টন, জেনন, আর্গনের মত নিষ্ক্রিয় গ্যাসসমূহ, যেগুলো চর্বিতে দ্রবণীয় এবং রিঅ্যাক্টরের আশপাশে বসবাসকারী কোনো লোক তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে তা তার ফুসফুসের মাধ্যমে প্রজনন অঙ্গসহ দেহের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে স্থানান্তরিত হতে পারে। তদুপরি তেজস্ক্রিয় মৌলগুলো হতে নিঃসরিত গামা রশ্মি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুতে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়ে সূচনা করতে পারে বংশানুসৃত রোগের। ট্রিটিয়াম নামক হাইড্রোজেনের একটি আইসোটোপও আমরা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাই, যা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় পানি উৎপন্ন করে। এই পানি ত্বক, ফুসফুস এবং পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে লোকজনের দেহে প্রবেশ করে তার ডিএনএ মলিকিউলে ঢুকে যেতে পারে যার পরিণাম বড় ধরনের বিপর্যয়।

নারী ও শিশু দ্রুত ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে
২০০৮ সালে জার্মান সরকার তার বাণিজ্যিক ১৬টি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী শিশুদের ওপর একটি গবেষণা চালায়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে যতই যাওয়া যায় শিশুদের দেহে ক্যান্সার বিশেষত লিউকোমিয়ায় আক্রান্তের ঝুঁকি তত বাড়তে থাকে। ওই গবেষণা থেকে জানা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫ কিমি ব্যাসার্ধের মাঝে বসবাসকারী শিশুদের লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তার বাইরে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় অন্ততপক্ষে দ্বিগুণ। গবেষণায় দেখা যায়, পরমাণু রিঅ্যাক্টরের আশপাশে অবস্থিত লোকালয়গুলোতে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২৬-২৮ জন, যেখানে গড়পড়তা স্তন ক্যান্সারজনিত মৃত্যুহার হচ্ছে প্রতি লাখে ২০-২২ জন। এই গবেষণাটি হয়েছে যুক্তরাষ্টে যারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ডিপার্টমেন্টের গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে পুরনো পরমাণু কেন্দ্রগুলোর আশপাশে স্তন ক্যান্সারজনিত মৃত্যুহার ১৯৫০-৫৪ থেকে ১৯৮৫-৮৯ সময়কালে বেড়েছে ৩৭ শতাংশ, যেখানে পুরো আমেরিকাজুড়ে গড়ে তা বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ।

বিস্ফোরিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করতে ৪০০ কোটি ডলার!
২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিয়েভ শহরের চেরোনোবিলে একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি রিঅ্যাক্টরের একটি বিস্ফোরিত হয় এবং তেজস্ক্রিয় মৌল ছড়িয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু অঞ্চলে। আজও চেরোনবিল শহর পরিত্যক্ত। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চেরোনোবিল দুর্ঘটনায় সবকিছু মিলিয়ে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে বন্ধ করতেই লেগেছিল ৪০০ কোটি ডলার।

গত ৩৩ বছরে নতুন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার থ্রি মাইল আইল্যান্ডে ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ একটি পরমাণু দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত নতুন আর কোনো পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮০ সালে থ্রি মাইল আইল্যান্ড ঘটনার পরপরই সুইডেন রেফারেন্ডামে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিষিদ্ধ করার দাবি তোলে। ১৯৮৬ সালের চেরোনোবিল দুর্ঘটনার পর সবাই ধরে নিয়েছিল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিন বুঝি এবার ফুরাচ্ছে। জার্মনি কেবল নতুন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধই করেনি। সেই সঙ্গে একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রগুলো। বেলজিয়াম, তাইওয়ান, জাপানও ক্রমে সরে আসছে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে। এমনকি নিজস্ব বিদ্যুতের শতকরা ৭৭ ভাগ পরমাণু শক্তি থেকে পাওয়া ফ্রান্সের জনগণ সেদেশের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করার জন্য সরকারকে ব্যাপকভাবে চাপ দিচ্ছে।

দেশে দেশে বন্ধ হচ্ছে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র
ব্রাজিলের ‘অ্যাংরা-১ পরমাণু কেন্দ্রটি কিছুদিন পরপর যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার কারণে ২০০০ সালের মে’তে হাজার হাজার গ্যালন তেজস্ক্রিয় নোনাপানি প্ল্যান্ট থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং খোদ ব্রাজিলে এই খবর ৪ মাস অপ্রকাশিত ছিল। পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানিটি এই খবর সরকারকে জানায়নি। এর ফলে ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হয় বিপুলসংখ্যক মানুষ। জাপানের বিপর্যয়ের পর জার্মানি ৭টি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। অবশ্য জাপানের ঘটনার আগে ফ্রান্স, ফিলিপাইনসহ কিছু দেশ কয়েকটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। সুইডেনে শেষ পরমাণু চুল্লি নির্মাণের কাজ হয়েছিল ১৯৮৫ সালে, স্পেনে ১৯৮৮, জার্মানিতে ১৯৮৯, ইংল্যান্ডে ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৮ সালে জার্মান সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, সে দেশের সবকটি চুল্লি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে। ২০০০ সালের মধ্যে ফ্রান্সে ২০০টি পরমাণু চুল্লি চালু হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে চালু চুল্লির সংখ্যা মাত্র ৫৯টি। নতুন চুল্লি নির্মাণেরও পরিকল্পনা নেই। ফ্রান্সে ইলেকট্রিসাইট দ্য ফ্রান্সের মতো সরকারি সংস্থা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক হওয়া সত্ত্বেও বিপুল খরচের দায়ে তারা দিশেহারা। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের বর্তমান ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৩শ’ কোটি ডলার।

রক্ষণাবেক্ষণের সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে?
সবাই যখন একের পর এক পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ সরকার পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে ‘সম্মানিত’ হওয়ার পরিকল্পনা আটছে। এতে জনগণ ভীত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে ভিভিআর-১০০০ মডেলের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র আমদানি করতে চায়। রাশিয়া কেবল রিঅ্যাক্টর এবং তার কাঁচামাল ইউরোনিয়াম বেচবে। স্বাস্থ্যগত, আর্থিকসহ সামগ্রিক ক্ষতির বিষয়টি যদি বাদও দেই তবুও প্রশ্ন থেকে যায় রাশিয়ার কাছ থেকে যে পরমাণু পাওয়ার প্ল্যান্ট কিনতে যাচ্ছে সেটা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কোনো সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে? পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানির উৎস ইউরেনিয়াম এবং সেই ইউরেনিয়ামের কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণের সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশ পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।

দিন যতই যাবে ততই বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়বে
পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ছাড়াও বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বৈদেশিক ঋণের জালে আটকে গেছে। বৈদেশিক ঋণ এবং শর্তের জালে আবদ্ধ দেশের জন্যে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাড়তি বিপদ হলো এর আর্থিক দায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় এককালীন বিনিয়োগের পরিমাণ বিপুল। আবার শুরুতে যে পরিমাণ অর্থের কথা বলা হয় তাও ঠিক থাকে না, দিন যত যায়, ততই বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকে। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বাংলাদেশকে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট নিতে হবে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ যে সব দেশ সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট কিংবা নানান ব্যাংক ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেখানেই শাসক শ্রেণী লাভবান হয়েছে, জনগণ হয়েছে আরো বেশি ঋণগ্রস্ত। এর বিনিময়ে জনগণ যে নিরাপদ, নিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহ পেয়েছে – তাও নয়।

ব্রাজিল: ৩২ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি ডলার!
ব্রাজিলের উদাহরণ যদি আমরা দেখি, ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত রিওডি জেনিরোতে তাদের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২ কোটি মার্কিন ডলার। ১৯৮৩ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এটির নির্মাণ ব্যয় দাঁড়ায় ২১০ কোটি ডলার। ১৯৮৩ সালে তাদের দ্বিতীয় পরমাণু কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬০ কোটি ডলার। নির্ধারিত সময়ের ১৮ বছর পর এর ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার কোটি ডলার। তৃতীয় পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের মাত্র ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করতেই ব্যয় হয় ২ হাজার কোটি ডলার। ব্রাজিল সরকার পরে এটি বন্ধ করে দেয়।

ফিলিপাইন: ৭০ কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি ডলার!
ফিলিপাইনে ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল ইলেকট্রিক ৭০ কোটি ডলার খরচে দুটি পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। ১৯৯২-এর শেষে সবকিছু মিলিয়ে এই পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে খরচ দাঁড়ায় ২৫০ কোটি ডলার। ফিলিপাইন সরকার নিয়োজিত একটা কমিশন কেন্দ্রটিতে প্রায় ৪ হাজার ত্রুটি খুঁজে পায় এবং একে অপারেশানে যাওয়ার জন্য অনুপযোগী বলে ঘোষণা দেয়। ফিলিপাইনের বাতান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শেষ হয় ১৯৮৫ সালে। কিন্তু নিরাপত্তা ও ব্যয়জনিত কারণে এর পরিচালনা স্থগিত করা হয়। এই কেন্দ্রের কারণে ফিলিপাইন সরকার ৫ হাজার কোটি ডলার ঋণগ্রস্ত হয়। এর ফলে ফিলিপিনের জনগণের কাঁধে সুদের বোঝা চেপেছিল দৈনিক ১৭ হাজার ডলার, ২০০৩-এর বছর শেষে যা গিয়ে দাঁড়ায় ১২০ কোটি ডলার। এই বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ফিলিপাইন সরকার ও ওয়েস্টিংহাউজ শেষ পর্যন্ত আদালতে মুখোমুখি হয়। এক পর্যায়ে ১৯৯৫ সালে ফিলিপাইন সরকার ওয়েস্টিংহাউজকে ১০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ এবং এর সঙ্গে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব ধরনের দায়-দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালে অপর একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০ কোটি ডলার। শেষ পর্যন্ত এর নির্মাণ ব্যয় দাঁড়ায় ৮০০ কোটি ডলার। নির্ধারিত সময়ের ১০ বছর পরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করেছিল।

ফিনল্যান্ড: ২৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার!
ফিনল্যান্ডের ‘অলকিলিওতো’তে (olkiluoto) একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে এখনো চলছে। এটি নির্মাণ করছে ফ্রান্সের বৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানি ‘আরেভা’। ফিনিশ সরকারের নিকট ‘আরেভা’ পূর্ব নির্ধারিত ব্যয় দেখিয়েছিল ২৫০ কোটি ডলার যা এরই মধ্যে ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এরই মধ্যে ‘আরেভা’ অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন না করলে কাজ বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছে।

বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এ কেন্দ্র থেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হওয়ার কথা। দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু হলে ২০২০ সাল নাগাদ ওই কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ পাবে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এই খরচ যে আরো বাড়বে সেটি নিশ্চিত।

যেভাবে খরচ দ্রুত বাড়তে থাকে
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) ২০০১ সালের এক সমীক্ষায় (Nuclear Power in OECD) দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি কিলোওয়াটে যেখানে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ডলার (নির্মাণকালীন সময়ে ঋণ নেওয়া সুদের হিসাব নিলে অংকটা আরো বড় হবে) ও সেখানে কয়লাতে পড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার এবং কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস প্ল্যান্টে পড়ে ৫০০ ডলার। ২০০৩ সালে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, যদি নতুন জেনারেশনের পরমাণু চুল্লি তৈরি করা যায়, তার খরচ হবে গ্যাস, কয়লা ও বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে দুই থেকে চার গুণ বেশি। তাছাড়া পরমাণু ইঞ্জিনিয়ারিং এজেন্সি ও আইএইএ’র হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ সালে পৃথিবীতে মোট মজুদ পরমাণু চুল্লির জ্বালানি ইউরেনিয়ামের পরিমাণ ছিল এক কোটি ৪৪ লাখ টন। প্রতি কেজি ৮০ ডলারের কম দামে আকরিক হিসাবে উদ্ধার করা যাবে ৩৫ লাখ টন। আরো বেশি ইউরেনিয়াম পেতে গেলে খরচ বাড়বে বলে ইউরেনিয়ামের দামও বেড়ে যাবে, আর ইউরেনিয়ামের দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ। আর সেই খরচ তুলতে সরকারকে বাড়াতে হবে বিদ্যুতের দাম।

ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশে দেশে বন্ধ হচ্ছে চুল্লি
১৯৭৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চালু পরমাণু চুল্লির সংখ্যা ছিল ৬৭, আরো ১৫৬টি তৈরির তোড়জোড় চলছিল। পরবর্তীতে আরো প্রায় ২০০টি চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল যাতে করে ২০০০ সালের মধ্যে ৪০০টি চুল্লি স্থাপন করা যায়। বর্তমানে সে দেশে ১০৪টি চুল্লি থেকে ৯৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেনেসির ওয়াটসবার পরমাণু চুল্লির কাজ শেষ হয়েছিল, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত পরমাণু চুল্লি নির্মাণের কাজ পুরোপুরি বন্ধ। ১৯৭৮ সালের পর থেকে সে দেশে ১২০টি চুল্লি স্থাপনের প্রস্তাব ও পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। বাতিল করার কারণ হিসেবে অত্যধিক খরচ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণের সমস্যার কথা বলা হয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ বলে অন্তত ৫টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকটি ক্ষেত্রে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পর সমাপ্ত প্রায় কেন্দ্র নির্মাণের কাজ বাতিল করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারে সমুদ্রতটের কাছে দু’টি পরমাণু চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। খরচ ধরা হয়েছিল ৯০ কোটি ডলার। ১৯৮৮ সালে যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লাইসেন্স পাওয়া যায় ততদিনে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬০০ কোটি ডলার। কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। লং আইল্যান্ডের শোরহ্যামে পরমাণু চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হলে ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটি দীর্ঘদিন চলে। এর মধ্যে কেন্দ্রটি নির্মাণের খরচ দাঁড়ায় ৫৪০ কোটি ডলার। কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মুখে ওই কেন্দ্রটি নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষ মাত্র এক ডলার মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছিল। ১৯৮২ সালে এনআরসি ১০ লাখ ডলার ব্যয়ে কেন্দ্রটির ডিকমিশনিং অনুমোদন করে।

বিকল্প পন্থায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ
রূপপুর প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, বিভিন্ন দেশের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক যে হিসাব দেওয়া হয় শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণ বেশি। অথচ ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে খরচ হয় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ রকম আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সম্ভব, যেখান থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) কয়লা, গ্যাস ও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়ের যে হিসাব দিয়েছে, সেখানেও দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচ অনেক বেশি। আইইএ হিসাব মতে, একটি ২৫০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ হয় ১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি টাকায় ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব, যেখান থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। অন্যদিকে আইইএ’র হিসাবে ২৫০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ হয় ১ হাজার ৬৫ কোটি টাকা, যা দিয়ে ৯টি ২৫০ মেগাওয়াট সম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সম্ভব। এছাড়া বায়ু ও সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচ আরো কম। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ব্যয় জ্বালানি তেল, কয়লা, গ্যাস, পানি, বায়ু ও সোলার এনার্জির চেয়ে অনেকগুণে বেশি। এখানে স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্ভবনাও নেই। তাহলে বাংলাদেশ এই বিপজ্জনক ও বাড়তি খরচের পথে এগুচ্ছে কেন?

দেশে বিপর্যয় ঘটলে কোনোক্রমেই সামাল দেওয়া যাবে না!
বাংলাদেশের ভৌগলিক ও জনসংখ্যা ঘনত্বের কারণে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো দুর্ঘটনায় যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে তা সামাল দেওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। জাপানের মতো উন্নত দেশও এখন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপর্যয় এড়াতে পারছে না। চেরোনোবিল, থ্রি মাইল আইল্যান্ডের মতো বড় বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে প্রযুক্তির দিক দিয়ে শীর্ষে অবস্থানকারী দেশগুলোতে। যারা নিজস্ব দক্ষতাকে কেন্দ্র করে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। আর বাংলাদেশের মতো দেশের যেখানে সামান্য পানি, তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দু’দিন পর পর বিকল হয়ে যায় এবং মেরামতের অভাবে পড়ে থাকে বছরের পর বছর সেখানে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি ভালোভাবে চলবে সেটা কল্পনাও করা যায় না।

ভারত-পাকিস্তানের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রও বাংলাদেশের জন্য হুমকি
শুধু বাংলাদেশের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রই নয় ভারত ও পাকিস্তানের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও বন্ধ করা জরুরি। ভারতে ২০টি পরমাণু চুল্লির মাধ্যমে ছয়টি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ হাজার ৭৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। আরো পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। পাকিস্থানে আছে তিনটি যার মাধ্যমে সে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ উৎপাদিত হয়। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপক্ষে সে দেশের সচেতন মানুষ স্বোচ্চার। বাংলাদেশের যেমন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ব্যয় বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়, তেমনি ভারত ও পাকিস্তানে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ করা জরুরি। কারণ উপমহাদেশের ভোগোলিক ও জনসংখ্যাগত অবস্থান কোনোক্রমেই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপযোগী নয়। এখানে অবস্থিত যে কোনো একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপর্যয় এই অঞ্চলে মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। উন্নত দেশগুলো যেখানে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে অসহায় সেখানে দারিদ্র্যপীড়িত এই অঞ্চলে সেই ব্যবস্থা কোনোক্রমেই উপযোগী ও টেকসই নয়।

সূত্র:
দৈনিক প্রথম আলো, সাপ্তাহিক বুধবার, উইকিপিডিয়া, সামহোয়্যারইনব্লগ, ফেসবুক।

 

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা