|

কাদের মোল্লার ফাঁসি হবে কবে?

 kader-mollah

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এটিই মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের প্রথম রায়।

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আপিলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন। বেঞ্চের বিচারপতিরা হলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। এ রায়ের পর তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তরুণ সমাজের ডাকে শাহবাগে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। পরে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সমান সুযোগ রেখে ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) সংশোধন বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আগে আইনে সরকারের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ ছিল না। গত ৩ মার্চ সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরদিন আপিল করেন কাদের মোল্লা। গত ১ এপ্রিল থেকে শুনানি শুরু হয়।

আসামি ও সরকার—উভয় পক্ষের দুটি আপিলের ওপর ৩৯ কার্যদিবস শুনানি শেষে ২৩ জুলাই আপিল বিভাগ রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। শুনানি শেষ হওয়ার ৫৪ দিনের মাথায় চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়।

 

কবে হবে ফাঁসি?

এদিকে কাদের মোল্লার পূড়ান্ত ফাঁসির আদেশ শোনার পর সর্বমহলে একটা স্বস্থির

নিঃশ্বাস দেখা দিলেও একটা প্রশ্ন সর্বত্রই উঠছে, আর তা হচ্ছে, কবে ফাঁসি হবে কাদের মোল্লার?

সরকারের এই মেয়াদেই রায় কার্যকর: হানিফ : জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘রায়ে আওয়ামী লীগ সন্তুষ্ট। এতে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। ৪৫ দিনের মধ্যে রায় কার্যকর করার বিধান রয়েছে। তবে আশা করি সরকারের এই মেয়াদেই ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে।’

 

সরকার যেদিন চাইবে সেদিনই ফাঁসি কার্যকর : সরকার যেভাবে এবং যেদিন চাইবে সেদিনই জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হবে। প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও জেল কোডের বিধান যুদ্ধাপরাধের দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কেননা আন্তর্জাতিক অপরাধসূমহ ট্রাইব্যুনালস (আইন) ১৯৭৩ এর ২০(৩) ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অধীন প্রদত্ত দণ্ড কার্যকর হইবে সরকারের আদেশাবলী অনুযায়ী।’

তবে সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের ঘোষিত যে কোন রায় বা আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন জানানোর সুযোগ আসামি পক্ষের রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রুলস অনুযায়ী রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ড. তুরিন আফরোজ বলেছেন, কাদের মোল্লা রিভিউ পিটিশনের সুযোগ পেলেও তার এই আবেদন দাখিলের দিনেই আপিল বিভাগ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। রায়ে মারাত্মক ত্রুটি না থাকলে এবং আইনের গুরুতর ব্যত্যয় না থাকলে সাধারণত আপিল বিভাগ রিভিউ পিটিশন গ্রহণ করে না।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গতকাল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডাদেশের প্রশ্নে বিভক্ত রায় দিয়েছেন। পাঁচ জন বিচারকের মধ্যে চারজনই মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে একমত হয়েছেন। বিভক্ত রায় হওয়ার কারণে চার বিচারপতির রায়ের পর ভিন্নমত দেয়ার বিচারপতি তার রায় লিখবেন। তারপর দুটি রায় একত্রে প্রকাশিত হবে।

ওই রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রুলস অনুযায়ী রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট আগামী ১০ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত অবকাশে থাকবে। রায় যদি অবকাশের আগে প্রকাশিত হয় তাহলেও অবকাশের আগে রিভিউ পিটিশনের শুনানি হচ্ছে না। রায় যেদিনই প্রকাশিত হোক অবকাশকালীন ২৩ দিন সময় ৩০ দিনের গণনা থেকে বাদ যাবে।

সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংসদের যে কোন আইনের বিধি-বিধানাবলী সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোন বিধি- সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোন ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।”

অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট আনিসুল হকও একই অভিমত দিয়েছেন। তিনি বলেন, সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামির রিভিউ পিটিশন দায়েরের অধিকার রয়েছে। কাদের মোল্লাকে এই সাংবিধানিক অধিকার দেয়া হলে এই রায়ের স্বচ্ছতা নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হবে না।

প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজও এই মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন, কাদের মোল্লা রিভিউ পিটিশন দাখিলের সুযোগ পাবেন। তবে তার রিভিউ পিটিশন গ্রহণ করা বা না করার সম্পূর্ণ এখতিয়ার আপিল বিভাগের রয়েছে।

তাদের এই মতের সঙ্গে অবশ্য দ্বিমত পোষণ করেছেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। তারা বলেন, সংবিধান সংশোধন করে এই আইন করা হয়েছে। এটি একটি বিশেষ আইন। এই আইনে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল বিচার করবে। বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করা যাবে। এর বাইরে আইনে আর কোন কিছুর সুযোগ দেয়া হয়নি। তাই রিভিউর কোন সুযোগ নেই।

আসামি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রিভিউ করা কাদের মোল্লার সাংবিধানিক অধিকার। এই সুপ্রিম কোর্টও সৃষ্টি হয়েছে সংবিধানের দ্বারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এই সুপ্রিম কোর্ট সৃষ্টি হয়নি।

অন্যদিকে, আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুদ্ধাপরাধ আইন বা প্রচলিত আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন সংবিধানকেই প্রাধান্য দিতে হবে আপিল বিভাগকে। সেক্ষেত্রে রিভিউ পিটিশন দাখিলের সুযোগ পাবে আসামি পক্ষ। তবে শতকরা ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই রিভিউ পিটিশন গৃহীত হয় না। সংক্ষিপ্ত শুনানির পরই তা সাধারণত খারিজ করা হয়ে থাকে। রায়ে মারাত্মক ত্রুটি কিংবা আইনের ভুল ব্যাখ্যা রয়েছে—আবেদনে এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত থাকলেই কেবল রিভিউ পিটিশন গৃহীত হতে পারে।

-সময়ের কথা ডেস্ক

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা