|

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড : আমাদের বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নিয়ে কথা

aviতুষার গায়েন: অভিজিৎ রায়কে নিয়ে কিছু লেখার জন্য আমার এক প্রিয় বন্ধু অনুরোধ করেছেন। কিন্তু কী লিখব? লিখতে গেলে প্রথমেই ভেসে ওঠে রক্তস্মৃতি, বইমেলা শেষে ফিরে আসার পথে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশের ফুটপাতে পড়ে থাকা রক্ত আর মগজের আল্পনা, লাল ও সাদার করুণ-বীভৎস বিন্যাস,মানুষের জটলা; পুলিশ এবং আকস্মিক নিভে যাওয়া উদ্যানের আলো– ত্রস্ত ছুটে চলা মানুষের ভয়ার্ত-বিষণ্ন মুখ। জানুয়ারির প্রথমার্ধ থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বোমা মেরে মানুষ হত্যার যে নারকীয় তাণ্ডব চলছিল, তাতে কোনো মৃত্যুই যেন স্নায়ু বিপর্যয়কারী নয়, যেন তা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ– দাবী করছিল বেঁচে থাকার স্বার্থে ক্রমাগত অভিযোজন করে নিতে; তাই কালবিলম্ব না করে অদূরে শাহবাগে এসে আমি আরো দু’একজন কবিবন্ধুর সাথে চা খেতে ফুটপাতে বসে পড়ি, নিরুদ্বিগ্ন সিগারেট টানি ! তখনও জানি না যে কেবলই দেখে আসা রক্ত-মগজ কোনো অজ্ঞাত মানুষের উদ্দেশে ছুঁড়ে দেওয়া মৃত্যুর নিয়তি নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের কোনো সফল নাটিকা। শাহবাগ থেকে রিক্সা করে একাকী ফেরার পথে পকেটের মোবাইল বেজে ওঠে, বাসা থেকে ভাইয়ের ফোন, “তুমি কোথায়,তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরো, অভিজিৎ রায় খুন হয়েছেন !”

একজন মানুষ লেখার জন্য খুন হয়েছেন। পৃথিবীর বেশ কিছু অসভ্য ও বর্বর দেশের মত বাংলাদেশেও একথা মেনে নেয়া হয়েছে যে বিশেষ একটি ধর্মের সমালোচনা বা তার বিশ্বাসব্যবস্থা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করলে প্রশ্নকারীকে হত্যা করা যেতে পারে এবং তাতে রাষ্ট্রের ও আপামর জনসাধারণের কোনো আপত্তি নেই, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। যারা ব্যতিক্রম তারাও অগ্রসরমান হত্যা তালিকার অন্তর্ভূক্ত। মূল বিরোধ চিহ্নিত হচ্ছে আস্তিক ও নাস্তিকতার নামে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই আস্তিকতা ও নাস্তিকতার স্বরূপ কী? আস্তিকতা এবং নাস্তিকতার সীমানা কী কোনো মোটা দাগে সনাক্ত করে বলা যায় যে এর বাইরে গেলে কেউ নাস্তিক অথবা আস্তিক? আস্তিক্য এবং নাস্তিক্যের মধ্যেও তো কত প্রকারভেদ ! একই ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের ভিতরেও বিশ্বাসের ভেদ আছে এবং সেইভাবে বিভিন্ন তরিকা আছে। কেউ কেউ মনে করেন তার ধর্মপুস্তকে যা লেখা আছে, তার প্রতিটি অক্ষর সত্য, ঐশীপ্রদত্ত এবং তাই এ নিয়ে কোনো সমালোচনা সহ্যাতীত। অথচ সেই একই ধর্ম পালনকারী ও বিশ্বাসী অনেকেই মনে করেন, নাহ্‌, তার ধর্মের অনেক কিছুই বুজরুকি, মানুষের বানানো ও মানববিরোধী এবং কোনোভাবেই তা আধুনিক মানুষের উপযোগী নয়; কিন্তু সমগ্র সৃষ্টিকে প্রকাশ ও ধারণকারী এক পরমসত্তার উপস্থিতিতে তারা বিশ্বাস করেন যা তার বহু ত্রুটি সম্পন্ন ধর্মের মহত্তম উপলব্ধি। আর তাই কালে কালে ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের ভিতর ধর্ম সংস্কারকদের আবির্ভাবও প্রাকৃতিক নিয়মেই দেখা যায়। ধর্ম (religion) ও আধ্যাত্মিকতা (spirituality) তাই অনেকের কাছে সমার্থ বহন করে না।

2627E66A00000578-2971508-Brutal_This_image_circulated_by_extremists_on_social_media_shows-a-66_1425059963888এর বাইরেও অনেকেই রয়েছেন যারা প্রচলিত ধর্মের কোনো কিছুই পালন করেন না বা তাতে আস্থা রাখেন না, কিন্তু পরম সত্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন এবং বিভিন্ন উপায়ে সেই পরম সত্তার সাথে আত্মিক সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। তারা বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্যে কোনো বিরোধ দেখেন না, কারণ তারা মনে করেন বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতা চূড়ান্ত বিচারে আর কিছুই নয়, বরং মহাপ্রকৃতিকে আবিস্কার ও উপলব্ধি করার ভিন্ন ভিন্ন উপায় মাত্র। রবীন্দ্রনাথের কথাই ধরুন, যিনি সারাজীবন ধরে তাঁর কবিতা, গান ও সৃষ্টিকর্মে একজন জীবনদেবতার অস্তিত্ব অনুভব ও তার সন্ধান করে গেছেন যা প্রচলিত ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ঈশ্বর বিশ্বাসের সাথে সমার্থক না হলেও, এক পরম সত্তার অস্তিত্বে আস্থাশীল। পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের নিবিষ্ট পাঠক, অনুসারী এবং তার স্বাক্ষর রেখে গেছেন বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ

‘বিশ্ব পরিচয়’ রচনা করে। আইনস্টাইনের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ও কথোপকথন এক্ষেত্রে স্মরণীয়। কবির কথাই যখন আসল তখন তো লালনশাহী এবং জালালউদ্দিন রুমীর কথাও স্মরণ করতে হয়, যাদের কেউ প্রচলিত কোনো ধর্মে অন্ধ আস্থা স্থাপন করেন নি, বরং আধ্যাত্মিকতার চর্চা ও সন্ধান করেছেন যা মানব হিতৈষীও বটে ! এরও আগে যদি যাই, তাহলে মহামতি বুদ্ধের কথা বলতে হয়। প্রচলিত অর্থে তিনি আস্তিক নন, বরং স্বকালে নাস্তিক হিসেবেই বিবেচিত হতেন। কারণ ঈশ্বর বিষয়ে কোনো প্রশ্নে তিনি নীরব থাকতেন এবং ঈশ্বর বিশ্বাস নিয়ে তিনি কিছু প্রচার করেন নি, কিন্তু বোধিবৃক্ষের তলায় বছরের পর বছর চোখ বুজে যার সন্ধান করেছিলেন, তা কী? তা ছিল সত্তা ও সৃষ্টি সম্পর্কিত জিজ্ঞাসা এবং পরম বোধিলাভ যা তিনি মানব কল্যানে প্রচার করে গেছেন। যে পথে তিনি বোধির সন্ধান করলেন, তা প্রচলিত অর্থে বস্তুবাদ বা বিজ্ঞানের পথ নয়, বরং প্রাচীন ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাধনার যে ঐতিহ্য, সেই পথ, অর্থাৎ ধ্যান ও যোগ। আজকের একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে, প্রচলিত ধর্মে অবিশ্বাসী ও বিজ্ঞানে বিশ্বাসী, কিন্তু ধ্যান সাধনার মাধ্যমে পরমের সন্ধান করছেন এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

প্রচলিত অর্থে নাস্তিক বলতে বোঝায়, যারা প্রচলিত ধর্ম এবং কোনো ধরণের পরম সত্তার অস্তিত্ব বা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। তারা বস্তুবাদী দর্শন ও বিজ্ঞানের ধারায় পৃথিবীকে দেখেন, বিশ্লেষণ করেন এবং প্রয়োগ করেন। তারা প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তা স্বকীয় যুক্তির আলোকে খণ্ডন ও নাকচ করেন। তারা এটা করেন এই বিশ্বাসে যে ধর্ম ও ঈশ্বর বিশ্বাস মানুষের চিন্তা ও বিকাশের ক্ষেত্রে বড় বাধা এবং সভ্যতার অগ্রগতির অন্তরায়। আজকের আধুনিক পৃথিবী এবং জীবনযাপনের সমস্ত উপকরণ এবং ব্যবস্থাদি মূলত এই শ্রেনীর মানুষের মাধ্যমে অর্জিত। আদি ধর্ম পুস্তকগুলোতে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব, মহাকাশ জ্ঞান, প্রাণের উৎপত্তি এবং মানব সম্পর্কে অবিচল আস্থা রেখে তাদের পক্ষে এই অর্জন করা সম্ভব হত না এবং পৃথিবী আজকের অবস্থায় উপনীত হত না। যদিও পরম সত্তা অথবা ঈশ্বরে বিশ্বাসী বিজ্ঞানীও সভ্যতায় দূর্লক্ষ্য নয়। অভিজিৎ রায় প্রচলিত অর্থে নাস্তিক ছিলেন এবং তিনি তার বক্তব্যকে যুক্তি, তথ্য এবং বিজ্ঞানের আলোয় উপস্থাপন করতেন যা প্রচলিত ধর্ম ও ঈশ্বর বিশ্বাসে আঘাত হানত। পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মই বিজ্ঞানের এই আঘাত সহ্য করে টিকে আছে এবং অনেক সংস্কারাদির মাধ্যমে প্রাচীন বিশ্বাস ও মতামতকে পরিবর্তন করে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিবর্তন হয়ত ধর্ম পুস্তকে তারা লিপিবদ্ধ করেন নি, কিন্তু বৌদ্ধিকভাবে তারা গ্রহন করেছেন। তাই ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে সমালোচনা করলেই খঞ্জর হাতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন না, তাদের বিশ্বাসই একমাত্র ঠিক এবং তা সমালোচনাতীত, এমন কোনো চিন্তার দাসত্বেও তারা আস্থাশীল নয়। যদিও মৌলবাদ এখনও সব ধর্মের মধ্যেই মাত্রাভেদে ক্রিয়াশীল এবং দুরারোগ্যভাবে অচিকিৎস্য।

avijitএখন মোদ্দা কথা হচ্ছে, বিভিন্ন প্রকারভেদে আমরা বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, আস্তিক ও নাস্তিকরা এই পৃথিবীতে বাস করি। প্রত্যেক ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসী মানব সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা আলাদা করে পৃথিবী আমাদের জন্য বরাদ্দ নাই। আমরা এক অনন্ত বৌদ্ধিক ও মানসিক বিবর্তনের পথে পাশাপাশি চলেছি। তাহলে, কীভাবে আমরা এই পৃথিবীতে থাকব যেখানে আমাদের বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নিয়ে, একে অপরের জন্য হন্তারক না হয়ে থাকতে পারি? এটা তো খুবই স্পষ্ট যে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ কোনো একটা নির্দিষ্ট বিশ্বাস বা উপলব্ধিতে আস্থা স্থাপন করবে না, তা সে যতই ঐশী বিশ্বাস, আদেশ অথবা বিজ্ঞানের মহৎ আবিস্কার বা সূত্র হোক। আবার এটাও তো ঠিক, প্রত্যেক মানুষই তার বৌদ্ধিক, আধ্যাত্মিক ও মাননিক অর্জনের ভিত্তিতেই তার মত প্রকাশ করবে এবং সেটা করার অধিকার তাকে দিতে হবে। কারণ পৃথিবীটা তো কোনো বিশেষ একটা সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দকৃত নয় যা আগেই বলেছি। যেহেতু আমাদের মত-ভিন্নতা আছে, তাই সেই মত প্রকাশে আমাদের কারো কারো মনে আঘাত লাগতেও পারে। সেই আঘাত প্রশমনের জন্য আমরা কী করতে পারি? চাপাতি হাতে দৌঁড়ে গিয়ে তার গলা কেটে নিজের বিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করতে পারি নাকি জ্ঞান ও বোধির উন্মোচনের মাধ্যমে তা করতে পারি? এটা তো সহজেই অনুমেয় যে আমার পরাজয় সেই মূহুর্তে সাড়ম্বরে ঘোষিত হচ্ছে যখন আমার বিশ্বাস এতই দূর্বল যে প্রতিপক্ষকে যুক্তি ও বোধিতে নিধন করতে না পেরে, আমাকে অস্ত্র হাতে তার মস্তক ছিন্ন করে সেটা করতে হচ্ছে। সেটা কী সম্মানের ব্যাপার? এখানেই আসে রাষ্ট্রের ভূমিকা। ব্যক্তি বা সম্প্রদায় বিশেষ সেই অন্ধত্ব প্রদর্শন করে যদি প্রতিপক্ষের গলা কাটে বা কাটতে উদ্যত হয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই উন্মাদকে প্রতিহত করা এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা যেখানে সবারই নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকার থাকবে। পুরনো কিন্তু সেই চির নতুন কথাই পুনরাবৃত্তি করতে হয়, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।” ধর্মানুভূতিতে আঘাত করার কথা বলে কারো গলা কাটার অধিকার রাষ্ট্র বা সরকার কাউকে দিতে পারে না। যদি দেয়, তাহলে বলতে হবে সেই রাষ্ট্র সব মানুষের জন্য নয়, কোন একটা নির্দিষ্ট বিশ্বাসী উন্মাদদের জন্য, অর্থাৎ তা একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। বাংলাদেশ কী সেই ব্যর্থ রাষ্ট্রের অভিধা পেয়ে আহ্লাদিত, খুশী?

ক্যালগেরি, কানাডা
২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

একটি মন্তব্য - খবর: “অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড : আমাদের বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নিয়ে কথা”

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা