|

যুগে যুগে সমাজ বিবর্তনের ধারায় শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা

munaemমোনায়েম সরকার: পৃথিবীতে সমাজতন্ত্রীদের যখন সোনালি দিন ছিল, তখন মে দিবস উদযাপিত হতো অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে। পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আর আর্মির শোভাযাত্রা যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন সেদিনের মে দিবস আর আজকের মে দিবসে আঙ্গিকগত পার্থক্য থাকলেও চেতনাগত কোনো পার্থক্য নেই। মানুষের জীবন যাপন সুস্থ-সুন্দর ও মানবিক করার জন্য মানুষের চেষ্টার কোনো বিরাম নেই। কিভাবে যাপিত জীবনকে অর্থবহ ও সার্থক করে তোলা যায় এই ভাবনা পৃথিবীর সবদেশের সব শ্রেণির মানুষের মাঝেই কমবেশি ক্রিয়াশীল। কিন্তু জীবনকে সুন্দর, সার্থক, অর্থবহ করার জন্য শুধু মানুষের চেষ্টাই যথেষ্ট নয় এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবেশ ও পরিস্থিতির যোগসূত্র। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় কোনো সুন্দর স্বপ্ন বাস্তবায়ন। তবে এটাও ঠিক মানুষই পারে তার শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে অনুকূলে আনতে। অসমশক্তির সঙ্গে লড়াই-সংগ্রাম করে যুগে যুগে যারা পৃথিবীকে পরিবর্তিত করেছেন তারা হলেন শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ। এই শ্রমজীবী মানুষের বুকে পা ফেলেই আসে নব সব উত্থান, শ্রমিকরাই তাদের দেহের শক্তি আর রক্তের বিনিময়ে তৈরি করে সভ্যতার সোনালি সরণি। নজরুলের ভাষায়ঃ

আসিতেছে শুভদিন,

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ!

হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,

পাহাড়-কাটা সে পথের দুপাশে পড়িয়া যাদের হাড়,

তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,

তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধুলি;

তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,

তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান।

অনেকে মনে করেন ১৮৮৬ সালের ১ মে’র পর থেকেই শ্রমিকদের অবস্থা বদলাতে শুরু করেছে। বিষয়টি কিন্তু তা নয়। ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে ৪ মে পর্যন্ত শিকাগো শহরে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে শ্রমিক শ্রেণি রচনা করেছে মে দিবসের সংগ্রামী ইতিহাস। শ্রমিক সংগ্রামের ঐ কয়দিনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অন্তত ১০ জন শ্রমিক। গ্রেফতার হন শ্রমিক নেতা স্পাইস ও ফিলডেন। পরবর্তীতে হে মার্কেটের ঘটনার দায় চাপানো হয় স্পাইসসহ অন্যান্য শ্রমিক নেতার উপর। এক সংক্ষিপ্ত ও প্রহসনমূলক বিচারে ফাঁসি হয়ে যায় শ্রমিক নেতা স্পাইস, পার্সনস, ফিলডেন, মাইকেল স্ড়্গোয়ার, জর্ড এঙ্গেলস ও খ্যাডলফ ফিসারের। ১৮৮৮ সালে আবারো ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়। সেই রক্তাক্ত ১ মে’তেই আন্দোলনের সূচনা হয়। বিশ্বের সকল দেশে শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে মে দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৮৯০ সালে। সেই থেকে মে দিবস শ্রমিক কৃষক মেহনতি মজদুরের দিন।

প্রথম মে-র‍্যালী, ১৯৬৭

প্রথম-মে র‍্যালী, ১৯৬৭, বুচারেস্ট।

এক সময় মানুষ বনে-জঙ্গলে-পাহাড়ে-পর্বতে বসবাস করতো। সেই বনচর মানুষেরা স্বাধীনভাবেই জীবনযাপন করতো। তাদের মধ্যে কোনো কলহ ছিল না, শোষণ ছিল না, উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয়ের কোনো মানসিকতাও ছিল না। বনচারী মানুষের সেই জীবনকে সমাজতাত্ত্বিকেরা নাম দিয়েছেন আদিম সাম্যবাদী সমাজ। সমাজ বিবর্তনের প্রয়োজনে আদিম সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তৈরি হয় দাসপ্রথা। দাসযুগে ব্যক্তি মানুষের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। দাসদের ছিল না স্বাধীন জীবন-যাপন করার অধিকার। দাস বিদ্রোহের পর আসে সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় দাসরা কিছুটা মানবিক অধিকার ফিরে পেলেও তাদের ভাগ্যোন্নয়ন পুরোপুরি হয় না। আবার শুরু হয় শোষিত মানুষের লড়াই। এই লড়াই চলতে থাকে যুগের পর যুগ। এক সময় ভেঙ্গে পড়ে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ। জন্ম নেয় নতুন পুঁজিপতিদের যুগ। এই নব্য পুঁজিবাদী যুগে এসেও শ্রমিক শ্রেণি শোষিত হতে থাকে নব্য পুঁজিপতিদের দ্বারা। পুঁজিপতিদের শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে আবার বিদ্রোহ করে শ্রমিক শ্রেণি। তারা বুঝতে পারে ধনীরা শ্রমিকদের শোষণ করে ধনের পাহাড় গড়ছে- আর কৌশলে শ্রমিকদের শোষণ করে যাচ্ছে। মহান দার্শনিক কার্ল-মার্কস শ্রমিকদের এই ক্রমাগত লড়াই-সংগ্রামকেই বলেছেন- ‘পৃথিবীর ইতিহাস মূলত শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস’ এ কথা এক অর্থে ঠিক। আবার অন্য অর্থে এটি মূলত সময়েরই দাবি।

আন্দোলনে সমাজবাদীরা, ইউনিয়ন স্কয়ার, নিউইয়র্ক, ১৯১২

আন্দোলনে সমাজবাদীরা, ইউনিয়ন স্কয়ার, নিউইয়র্ক, ১৯১২

আমার ছেলে বেলায় দেখেছি আমাদের জমিতে এক সময় একজন দিনমজুর চার আনায় কাজ করতো আজ সেই মজুরের বেতন কমপক্ষে ৫০০ টাকা। আগে যেখানে একজন পোশাক শ্রমিক কাজ করতো ৩০০/৪০০ টাকায়, এখন তাকে শুরুতেই দিতে হয় ৮০০০ টাকার উপরে। এটাকে শ্রমিক শ্রেণির লড়াইয়ের ফসল বলবো নাকি সময়ের প্রয়োজন বলবো? আমার বড়ভাই যখন সন্দ্বীপের মুন্সেফ ছিল তখন তার বাসায় দেখতাম অনেকগুলো কাজের লোক। একদিন আমার ভাবীকে জিজ্ঞাসা করলাম এতগুলো কাজের লোক কেন- তিনি বলেছিলেন, এরা কেউই তার বেতনভুক্ত কাজের মানুষ নয়। সবাই স্বেচ্ছায় শ্রম দিচ্ছে। কারণ মুন্সেফ কোর্টে কয়েকজন ‘পাংখা পুলার’ নিয়োগ করা হবে। তাই ১০/১২ জন লোক আগে থেকেই মুন্সেফ সাহেবের একটু সুদৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিনামূল্যে টুকিটাকি কাজ করে দিচ্ছে। তার মানে এই যে তখন কাজ ছিল না কিন্তু প্রচুর কাজের মানুষ ছিল। আজ কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, শ্রমিকের চাহিদাও বাড়ছে, তাই সহজেই শ্রমিকরা মালিকদের সঙ্গে দর কষাকষি করে কাজে যোগদান করতে পারছে। এটাকে শ্রেণি সংগ্রাম বলব নাকি নতুন আর্থ আমি বার বার একটি কথা বলার চেষ্টা করছি- পৃথিবী এখন নতুন মানবিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট প্রত্যাশা করছে। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের আর শোষণ করার সুযোগ নেই। শ্রমিকদেরকে তাদের ন্যায্য পাওনা দিতেই হবে। শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি না পেলে পুঁজি নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আজকের দিনে একজন শ্রমিক যে সকল সুযোগ-সুবিধা ও জীবনমান ভোগ একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন- এক সময় শ্রমিক আর মালিকের মধ্যে ছিল প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক। আজ সেই দূরত্ব অনেক খানি কমে এসেছে। এখনও মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব আছে, তবে সেই দ্বন্দ্ব আগের মতো অতি প্রকট আর সাংঘাতিক নয়। এখন মালিকরাই তাদের পুঁজি ও কারখানার স্বার্থে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার। এটা নিঃসন্দেহে একটি পজেটিভ পদক্ষেপ।

মার্কস-এঙ্গেলস কমিউনিস্ট পাটির ইশতেহার লিখে যে বিপ্লবের সম্ভাবনাকে উগড়ে দিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী কোথাও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধিত হয়নি। প্রথমে ফ্রান্স দেশে সাম্যের নামে যে ফরাসি বিপ্লব হয় সেই বিপ্লবের চরিত্রের সঙ্গে মার্বাদী বিপ্লবের তেমন মিল ছিল না। এরপরে শুরু রুশ বিপ্লব ও চীন বিপ্লব, রাশিয়ায় ও চীনে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছিল তা শ্রমিকের স্বার্থে যতটা না ছিল, তারচেয়ে বেশি ছিল পুঁজিবাদী শক্তি হ্রাস করার জন্য। তবে সমাজতন্ত্রীরা যে ধনবাদীদের শত্রু মনে করেছিল শোষক শ্রেণি হিসেবে সে কথা এক অর্থে ঠিকই ছিল। বর্তমানে টেকনোলজি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকের শ্রম লাঘব হয়ে গেছে। এখন একজন শ্রমিক কায়িক শ্রমের বদলে যান্ত্রিক শ্রমেই বেশি সময় ব্যয় করছেন। এখন হোয়াইট কলার শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, এটা শ্রম বিভাজনেরই লক্ষণ।

বিশ্বে এখন এক শতাংশ ধনপতী মানুষের হাতে যত টাকা আছে, বাকি নিরানব্বই শতাংশ লোকের হাতে আছে তত টাকা। এই কম সংখ্যক মানুষের ধন যদি সুষম বন্টন করা যেতো, তাহলে মানুষের অভাব অনেকটাই লাঘব করা যেতো। আজ আমেরিকা একক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয়ে দেখা দিয়েছে, তারা দেশে দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছে তেল সম্পদ ও অস্ত্র বিক্রির জন্য। তালেবান, আল-কায়দা থেকে আইএস- এসব তাদেরই সৃষ্টি। আজ তাদের দমানোর নামে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধে লিপ্ত আমেরিকা। মানুষ মারার জন্য অস্ত্র তৈরি বন্ধ রেখে যদি আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে আমেরিকা মানুষের জীবন জীবিকা উন্নয়নে মনোযোগী হতো, মানুষের জন্য সুন্দর কিছু করতো, তাহলে আরো সুন্দর হতো আমাদের পৃথিবী।

-০৩ মে, ২০১৬

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা