|

৪৫তম বিজয় দিবসে একাত্তরের চেতনায় জেগে উঠার সময় এসেছে

মোনায়েম সরকার: এবারের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪৫তম বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই বিশেষ দিনটিতে ২৬ মার্চ ৭১-এ সূচিত মহান মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এক সাগর রক্ত, ৩০ লক্ষ শহিদ আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের দামাল মুক্তিযোদ্ধারা মিত্র বাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় অপরাজেয়বিশাল পাক-হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। এই দিনটিতেই ৯৫ হাজার পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য তাদের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বে রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যৌথ বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিল। এই রমনা রেসকোর্স ময়দানে, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।কিন্তু বলদর্পী পাক সামরিক শাসকরা বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে ২৫ মার্চ গভীর রাতে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণের উপর অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে ঐ রাতেই, গ্রেফতারের আগে, বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেশবাসীকে যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বর্বরতার নিন্দা এবং বাংলাদেশের পক্ষে সাহায্য ও সহযোগিতার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। যে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ অপরাহ্ণে কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, সেই ময়দানেই ক্ষমতাদর্পী ৯৫ হাজার পাক হানাদার বাহিনীকে ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে আত্মসমর্পণ করতে হয়।

২০১৬ সালের বিজয় দিবস বাঙালি জাতির নিকট নতুন পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে হাজির হয়েছে। ২০০৮-এর ২৯শে ডিসেম্বর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৯-এর ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক সর্বসম্মত রায়ে, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির চূড়ান্ত রায় দিয়ে, দেশ ও দেশবাসীকে পিতৃহত্যার দায় থেকে মুক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ৩৫ বছর (মাঝে ৫ বছর আওয়ামী লীগ শাসন ছাড়া) দেশে বঙ্গবন্ধুকেই অপাংক্তেয় করে রাখা হয়েছিল, সেখানে স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস উদ্যাপন ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এই কালপর্বে যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা আওয়ামী লীগ, প্রতিবেশী মিত্র দেশ ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে এবং সাম্প্রদায়িকতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উস্কিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। তারা কথায় কথায় ভারতকে বাংলাদেশের সকল সমস্যার জন্য দায়ী করে জনগণকে বিভ্রান্ত করে তাদের স্বার্থ হাসিল করার প্রয়াস পেয়েছে।

স্বাধীনতাবিরোধীদের কাছে বাংলাদেশের বিজয় দিবসের তাৎপর্য স্বাধীনতার মূল চেতনার পরিপন্থী। কারণ, বিজয় দিবস মানে পাকিস্তানের পরাজয়ের দিবস। পাকিস্তানের পরাজয় বিএনপি-জামায়াত জোট নিজেদের পরাজয় বলেই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকরা আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূলে আঘাত করেছিল। হত্যাকা-ের সুবিধাভোগী জিয়া-এরশাদ ও খালেদা-জামায়াত জোট সরকারগুলি আমাদের পবিত্র সংবিধানকে বিকৃত করে  পাকিস্তানি ভাবধারা প্রতিস্থাপন করেছিল। খুনিদের রক্ষায় এ হেন হীন পন্থা নেই যা তারা গ্রহণ করেনি।

জিয়া-এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার জোট সরকারের আমলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালের বন্ধু প্রতিবেশী ভারতকে হেয় করার জন্য ভারতকে নন্দঘোষবানানো হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের সাথে চলতে স্বস্তিবোধ করে। তাদের শাসনামলে বকলমে পাকিস্তানের কুখ্যাত আই.এস.আই.ই. রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করেছে। ভারতকে অস্থিতিশীল করার জন্য আই.এস.আই-কে বাংলাদেশ ভূখ- ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাকে ট্রেনিং, অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতা করার অনুমতি দিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে অকারণে কুৎসা রটনা করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। যে ভারত ৯ মাস বাংলাদেশের ১ কোটি শরণার্থীকে খাইয়ে-পরিয়ে অতুলনীয় সহযোগিতা করেছে, লক্ষ লক্ষ মুক্তিবাহিনীর সদস্যকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিয়ে হানাদার পাক বাহিনীর মোকাবেলা করতে সক্ষম করে গড়ে তুলেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে হাজার হাজার ভারতীয় সেনা বাহিনী সদস্য রক্ত দিয়েছেন, অসংখ্য আহত হয়েছেন। সে কথা আমরা স্মরণ করলেও এদেশীয় পাকিস্তানি দালালরা তা করে না। ভারতীয় সৈন্য ফিরে যাওয়ার সময় আমাদের কি কি নিয়ে গেছে সেগুলি ফলাও করে প্রচার করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এ দেশীয় পাকিস্তানি দালালরা কখনও বিবেকের দংশন অনুভব করেনি। তখন ঘটা করে প্রচার করা হয়েছে যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী সেনানিবাসের বাতিগুলি পর্যন্ত নাকি খুলে নিয়ে গিয়েছিল। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তখন ক্ষমতাসীন না হয়ে অন্য কেউ ক্ষমতাসীন থাকলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাফল্য আসতে কত দিন লাগত তা গবেষণা করে বের করার বিষয় হতে পারতো। প্রসঙ্গত তিব্বতের দালাইলামার পরিণতির বিষয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তুলনীয় হতে পারে। অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে দালাইলামা যে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছেন, আমাদেরও তেমন অবস্থা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। মহান নেত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে, পরাশক্তি আমেরিকা ও চীনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত করেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি দিতে। সেই নেত্রীকে খাটো করতেও পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা পিছ পা হয়নি। এর চেয়ে অকৃতজ্ঞতা আর কি হতে পারে! যে রেসকোর্স ময়দানের মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন, যে মঞ্চ থেকে ইন্দিরা গান্ধী স্বাধীনতার পর ঢাকা সফরকালে বঙ্গবন্ধুসহ ভাষণ দিয়েছিলেন সেই স্থানটিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে এবং পাক বাহিনীকে আত্মসমর্পণের গ্লানি মুক্ত করতে সেই স্থানটিতে নির্মিত ইন্দিরা মঞ্চভেঙ্গে শিশু পার্ক নির্মাণ করেছিলেন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া। অন্যদিকে উদার মনোভাব প্রদর্শন করে ভারতের জনগণ কলকাতা শহরে দুইটি সড়কের নামকরণ করেছে শেরে বাংলা ও বঙ্গবন্ধুর নামে। আমরা কিন্তু আজ পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধী বা ইন্দিরা গান্ধীর নামে কোনো সড়ক বা স্থাপনার নামকরণ করতে পারিনি।

আমরা এ কথা ভুলে যাই যে, ইতিহাস বদলানো গেলেও ভূগোল বদলানো যায় না। আমরা যদি প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতকে কারণে-অকারণে শত্রুর পর্যায়ে ঠেলে দেই তাহলে নিজেদের আয়-উন্নতি করার সময় ও সুযোগ কি করে পাবো। ভারত একটি আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। তার অর্থনৈতিক অবস্থান এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম। তার সামরিক শক্তি বিশ্ব সামরিক শক্তির এক উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার সাথে পাকিস্তানের মতো গায়ে পড়ে বিবাদে লিপ্ত হওয়া কি বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ? ভারতের ভূত দেখতে দেখতে  পাকিস্তানের আজ কি হাল হয়েছে, সে দিকেও আমাদের খেয়াল রাখা প্রয়োজন। অথচ পঁচাত্তর পরবর্তী প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক ও বেসামরিক সরকারগুলি (১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকার ছাড়া) আমাদের সে পথে চালিত করেছে। পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা হচ্ছে দেশের স্বার্থএ কথা মনে রেখে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করলে সকল ঝামেলা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারি। কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তানের স্বার্থ ও বাংলাদেশের স্বার্থ এক হতে পারে না।

বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ গ্লাস টাওয়ার ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ধারণ করে জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইন্সটিটিউট, বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকাজুড়ে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ার প্রচেষ্টা চলছে।  

বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের বিচার সম্পন্ন হয়েছে, মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্ত খুনিদের বিরুদ্ধে আদালতের দেওয়া রায় কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার, আলবদরদের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এখন সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনার এবং বঙ্গবন্ধুর আমলের পররাষ্ট্র নীতিকে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে পুনর্বিন্যাস করার। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ফেব্রুয়ারি (২০১৭) মাসে ভারতে রাষ্ট্রীয় সফর করবেন, এই সুযোগে ভারতের সাথে অমীমাংসিত বিষয়গুলির (বিশেষ করে ভিসা জটিলতা) মীমাংসা এবং ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী ও সহযোগিতার নবযুগের সূচনা হবে। পঁয়তাল্লিশতম বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত জনগণের সামনে যে-সুযোগ সমুপস্থিত তা কাজে লাগিয়ে একাত্তরের চেতনায় জেগে উঠার সময় এসেছে।

১২ ডিসেম্বর, ২০১৬

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা