|

শারদীয় দুর্গোৎসবে অসুরবিনাশী দেবী দুর্গার আগমন

নজরুল ইসলাম তোফা: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আনন্দ আয়োজন শারদীয় দূর্গোৎসব। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশাল জনগোষ্ঠীর অনেক আনন্দ, উল্লাস এবং বিনোদনের আনুষ্ঠানিকতা লক্ষ করা যায় এমন উৎসবে।

শুভ মহালয়া থেকে চণ্ডীপাঠ, মহালয়ার ঘট স্থাপন ও বিশেষ পূজার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যলোকে আমন্ত্রণ জানায় ভক্তকুল। অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার করার লক্ষ্যে মর্ত্যে আসে দেবী দুর্গা। তাদের পূজা মণ্ডপে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী এবং মহানবমীতে সকল হিন্দু সম্প্রদায় অর্থাৎ হাজার হাজার নারী-পুরুষ ধর্মীয় নানা আচার অনুষ্ঠান পালন করে।

বলা দরকার, হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী দুর্গা পূজার দিন ক্ষণ গণনা শুরু হয় মহালয়ার দিনে অর্থাৎ ২৬ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে পাঁচদিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবে আনন্দকে কেন্দ্র করে। তাই এ দূর্গোৎসব হিন্দুদের অবশ্যই বিশুদ্ধ পঞ্জিকার আলোকেই নির্ধারণ করা হয়। শারদীয় দুর্গোৎ​সবের শুভ দশমীটাই তাদের কাছে শেষ দিন। আর এই শুভ বিজয়ার দশমীতে পূজা সমাপন করে এবং দেবী দুর্গাকে বিসর্জনে ব্যাস্ত সকল হিন্দু সম্প্রদায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে তারা এদেশ ও সারা বিশ্বে ৩০ সেপ্টেম্বর সনাতন ধর্মীয় জনগোষ্ঠী সকল মানবের চাহিদাকে পুরনের লক্ষে সর্ব বৃহৎ দেবী দুর্গাকে মণ্ডপে দাঁড় করানোর বাসনায় জাগ্রত হন।পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তারা মহানবমী উপলক্ষে অনেক পূজা মণ্ডপে আরতি প্রতিযোগিতা এবং প্রসাদ বিতরণ করে। দশমীতে সব মণ্ডপে থাকে বিষাদের সুর। কারণ, তাদের শুভ বিজয়া দশমীর এই দিনে দূর্গাকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে স্বামী গৃহে ফিরে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। সুতরাং এই দিনে বাহির হয় ভক্তদের শোভাযাত্রা, দেবী দুর্গাকে বিদায়ের মাধ্যম হিসেবে জলে নৌকা নয়তো স্হলে রংবে রংয়ের ট্রাকে সাজ সজ্জা ঘটিয়ে আনন্দ উল্লাস করে হিন্দু সম্প্রদায়। বিদায় বেলায় শত সহস্র ভক্তদের আনন্দ-উল্লাসে আর বিজয়ার অশ্রুতে আকাশ বাতাস কম্পিত হয়ে উঠে। দেবী দুর্গাকে স্বর্গালোকে এমন বিদায় দেয়ার আয়োজন সত্যিই সনাতন বিশ্বাসী ধর্মাবলম্বীদের গভীর আত্তায় শঙ্খ ধ্বনি এবং ঢাকের তালে তালে কম্পিত হয়। তাদের এমন দেবী দূর্গাকে বিদায়ের সুরের সাথে সঙ্গী সাথী করে গবীব দুখীকে। তবে এবারে দূর্গা দেবীর বিদায় নেওয়াটা অবশ্যই ঘোটক বা ঘোড়া কেন্দ্রিক অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে দেবী দুর্গা গমন করবে স্বর্গালোকে। সেহেতু এমন বিদায়ের ফল শ্রুতিতে অনেক রোগ-ব্যাধি বাড়বে বৈকি এবং অনেক ফসল নাকি নষ্টও হবে। সনাতন ধর্ম বিশ্বাসীদের এমন ধারনা এবং তাদের বিশুদ্ধ পঞ্জিকায় তার যথাযত সত্যতার প্রমাণ মিলে।তবে দেবী দূর্গা এসেছিল নৌকায় চড়ে, ধর্মের আদর্শ বার্তা নিয়ে বছর ঘোরে বারংবার দেবী দূর্গা আসে মর্ত্যলোকে অর্থাৎ পৃথিবীতে। এজগতের মঙ্গল কামনায়, তাই বিশ্বাসী হিন্দু সম্প্রদায় বলেন, এমন আগমনের ফলেই অতি বৃষ্টি ও শস্য বৃদ্ধি হবে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-পুরুষ ধর্মীয় এমন অনন্দে ঘরে ঘরে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে আপ্যায়নে তৈরী করে জল-তিল-অন্ন। এমন উৎসর্গ তাদের অনেক আনন্দ দান করে। তারা মনে করে, পিতৃ পক্ষে প্রয়াত আত্মারা স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে আসে। মৃত আত্মীয়-পরিজন এবং তাদের পূর্ব পুরুষদের আত্মার প্রতি মঙ্গল কামনা করার একটি শুভ দিন। সনাতন ধর্ম বিশ্বাসীরা এই দেবীপক্ষকে সবচেয়ে শুভ দিন মনে করেই নতুন নতুন পোষাক ও সামর্থ্য অনুযায়ী ভাল ভাল খাবার তৈবী করে। এ সময় তারা সব ধরনের শুভ কাজ সম্পন্ন করে থাকে। পুরাণের কথায় বলা যায়, অসুর শক্তির নিকট পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিল। চারদিকে অশুভের প্রতাপ। তাই এ অশুভ শক্তিকে ধ্বংস বা বিনাশ করতেই একত্র হন দেবতারা। অসুর শক্তির বিনাশে অনুভূত হয়েই এক মহা শক্তির আবির্ভাব। সুতরাং সেই দেবতাদের তেজরশ্মি থেকেই আবির্ভূত এক বৃহৎ শক্তি তিনিই হলেন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা।

পুরাণ মতে বলা যায়, রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেছিল। বসন্তে তিনি এ পূজার আয়োজন করায় দেবীর এ পূজাকে বাসন্তী পূজাও বলা হয়। কিন্তু রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে শ্রীরামচন্দ্র দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিল। শরৎ কালের এ পূজাকে হিন্দুদের মতে বলা চলে, অকালবোধন। তাদের ধর্ম মতে, এ দিনেই দেব-দেবীকুল দুর্গা পূজার জন্য নিজেদের জাগ্রত করে। মহালয়ার দিনে সূর্য উদয়ের আগেই শঙ্খধ্বনি এবং চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে মন্দিরে মন্দিরে নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সকল হিন্দু সম্প্রদায় দেবী দূর্গাকে আবাহন জানায় এবং উল্লসীত সুরেলা কন্ঠে জয়ধ্বনি তোলে, সবার বলো “দূর্গা মাইকি জয়”।

নজরুল ইসলাম তোফা,

‘টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক’।

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা