|

খ্রিস্টীয় নববর্ষে প্রত্যাশা

সৈয়দ জাহিদ হাসান: মহাকাল চির বহমান। অখ- মহাকালকে মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই সেকে-, মিনিট, ঘন্টা, দিন, মাস ও বছরে বিন্যাস করে নিয়েছে। অবশ্য এ বিন্যাসের পেছনে যৌক্তিক কতগুলো কারণও আছে। মানুষ লক্ষ্য করেছে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর প্রকৃতিতে একই রকম পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন গ্রীষ্মকালে দেখতে পাই দ্রোহী সূর্যের অগ্নিবর্ষণ, বর্ষায় আবার প্রকৃতিতে চলে আকাশ থেকে অশ্রু বর্ষণের খেলা। শীতকালে শীত সন্ন্যাসী নিসর্গের বুকে আঁকে রিক্ততার, শূন্যতার ছবি। বসন্তে আধমরা প্রকৃতি আবার ঠিকই পবিত্র পুষ্পের আলিঙ্গনে ঝলমল করে হেসে ওঠে। বাতাসে বাতাসে ভেসে আসে মধুর মিলনের আহ্বান।

যেকোনো বর্ষপঞ্জিতেই নববর্ষ উদ্দীপনার স্মারক। নববর্ষের প্রথম দিন মানুষকে আশাবাদী করে, হতাশা মুছে ফেলতে প্রেরণা দেয়। নৃত্যে, গীতে, আহারে, বিহারে, পোশাকে, পরিবেশে আনে নবপ্রাণ। নবপ্রাণ বলতে আমরা নবোদ্যমকেই বুঝি, বুঝি নতুন সম্ভাবনা। যেদিন ২০১৭ সাল আমাদের ঘরে এসেছিলো সেদিন আমরা নতুনভাবে বছরটিকে বরণ করেছিলাম। অবশ্য বরণ না করলেও নতুন বছরের আগমন আমরা রোধ করতে পারতাম না। যেমন পারছি না ২০১৮ সালের নবযাত্রা। পৃথিবীর সব মানুষ ঘুমিয়ে থাকলেও নববর্ষ পৃথিবীতে আসবে, সব মানুষ জেগে জেগে বর্ণিল অনুষ্ঠানে মেতে থাকলেও নববর্ষ আসবে। সময়ের চক্র নিজ কক্ষপথে নির্বিঘেœ ধাবমান। এই ধাবমান সময়ের চক্রে আমরাও আশা-নিরাশা, পাওয়া-না-পাওয়া নিয়ে আবর্তিত হচ্ছি। যতক্ষণ না মৃত্যুর হাতে আমরা ধরা পড়ছি মহাকালের নিয়মতান্ত্রিক চক্রে, আমাদের চক্কর খেতে হবেই।

বিগত সালে মানে ২০১৭-তে পৃথিবীর দেশে দেশে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। সেসব ঘটনার কিছু ছিল ইতিবাচক, আবার বেশ কিছু নেতিবাচক ঘটনাও ছিল। কে কিভাবে তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকে হিসাব করবেন জানি না, তবে আমার হিসেবে বিগত বছর অনেক সমস্যাক্রান্ত ছিল। দেশে দেশে জঙ্গিবাদ ভয়ঙ্কর ভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। কিছু শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের অধিকার হরণ করতে তৎপর ছিল। সমগ্র বিশ্বেই বাস্তুচ্যুত শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অকারণে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিত হয়েছে অগণিত নারী। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার মাত্রা অতিক্রম করে গিয়েছিল। অনেক বিশ্বস্ত বন্ধু-রাষ্ট্র শত্রু-রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। অনেক শত্রু রাষ্ট্র হয়েছিল ছদ্মবেশী সুহৃদ।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রতিদিনই দেখা গেছে কোনো না কোনো জনপদে। মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। ব্যবস্থা-বাণিজ্য মোটেই চাঙ্গা ছিল না, দুর্নীতি গ্রাস করেছিল পুরো বিশ্ব। নতুন বছরে অতীতের সব ক্ষত ভুলে যেতে চাই। ফিরে পেতে চাই নিরাপদ-মানবিক সমাজ। এ বছরে কোনো রক্তপাত চাই না। পৃথিবীর কোথাও কোনো কারণে যুদ্ধ বাঁধুক চাই না। নতুন বছরে মারণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ হোক, দেশে দেশে শুরু  হোক বিষমুক্ত খাদ্যশস্য আর গোলাপের আবাদ। নতুন সূর্য আমাদের পবিত্র করুক। শিশুদের হৃষ্ট-পুষ্ট-বলিষ্ঠ করুক রাষ্ট্রযন্ত্র। শিল্প-সাহিত্যের চর্চা নবপ্রাণ লাভ করুক। সুশিক্ষার অমল আলোক ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাক। কেউ কাউকে শত্রু না ভাবুক, বিমল বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে একে অপরকে প্রীতির বাঁধনে বাঁধুক। দুর্নীতি চিরতরে নিপাত যাক। সুনীতির চর্চা হোক, পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে ও সমগ্র বিশ্বে।

নতুন বছরে পরিবেশ সুন্দর ও দূষণমুক্ত হোক। জলবায়ু হোক নির্মল ও সহনীয়। প্রাণঘাতী কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পৃথিবীকে বিপর্যস্ত না করুক। বিশ্বজুড়ে বিরাজ করুক শান্তি, শান্তি শুধু শান্তি। বিগত বছরে যে মানুষ গৃহহীন হয়েছে সে একটি সুন্দর গৃহ ফিরে পাক। যে অসুস্থ রোগী অর্থের অভাবে তার বিমার সারাতে ব্যর্থ হয়েছে, চিকিৎসক বিনামূল্যে তার চিকিৎসা করুক। ভিখারী স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করুক। বিপথগামী দিশেহারা মানুষ খুঁজে পাক সর্বাঙ্গ সুন্দর পথের দিশা। শাস্ত্র বলছে, ‘মানুষ অমৃতের পুত্র। মানুষ অমৃতের পুত্র হোক বা না-হোক তবু অমৃতের সন্ধানই হোক সবদেশের সব মানুষের সাধনা। মানুষ বিশ্বাসঘাতক না হয়ে বিশ্বাস রক্ষা করার সক্ষমতা অর্জন করুক। মানুষের সান্নিধ্যে মানুষ পাক প্রশান্তির পরশ।

রাজনীতি সভ্যতা নির্মাণের অন্যতম উপাদান। নতুন বছরের মাহেন্দ্রক্ষণে দৈশিক ও বৈশিক রাজনীতি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ  হোক। সমাজের সর্বস্তরে শান্তি সুলভ হোক, দুঃখ বিনাশ হোক, স্বার্থপরতা পরিণত হোক পরার্থপরতায়।

শুরুতেই বলছিলাম মহাকালের কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাকালকে সন্ন্যাসী বলেছেন। বলেছেন নির্মম। রবীন্দ্রনাথ শেষসপ্তক কাব্যের সাত সংখ্যক কবিতায় বলেছেনÑ “মহাকাল, সন্ন্যাসী তুমি।/ তোমার অতলস্পর্শ ধ্যানের তরঙ্গ শিখরে/উচ্ছ্রিত হয়ে উঠছে সৃষ্টি/ আবার  নেমে যাচ্ছে ধ্যানের তরঙ্গতলে।/প্রচ- বেগে চলছে ব্যক্ত-অব্যক্তের চক্রনৃত্য,/তারি নিস্তব্ধ কেন্দ্রস্থলে/ তুমি আছ অবিচলিত আনন্দে,/ হে নির্মম, দাও আমাকে তোমার ওই সন্ন্যাসের দীক্ষা/ জীবন আর মৃত্যু, পাওয়া আর হারানোর মাঝখানে/ যেখানে আছে অক্ষুব্ধ শান্তি/ সেই সৃষ্টি- হোমাগ্নিশিখার অন্তরতম/ স্তিমিত নিভৃতে/ দাও আমাকে আশ্রয়।আদি-অন্তহীন মহাকালেরই খ-িত অংশ নববর্ষ। নববর্ষে আমাদের অন্তর শুদ্ধ হোক, নির্মল হোক, প্রেমে-পুণ্যে বিকশিত হোক। সুখ-শান্তি সমৃদ্ধিতে ভরে থাকুক পৃথিবীর বিশাল আঙিনা।  

 –লেখক : কবি ও কথাশিল্পী।

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা