|

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি, মোনায়েম সরকার ও অন্যান্যের ভূমিকা

সৈয়দ জাহিদ হাসান: ১৯৭১ বাঙালি জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বর্ষ। এ বছর বাঙালি জাতি অনেকগুলো ঐতিহাসিক অর্জন তার শূন্য ঝুলিতে ভরে নিতে সক্ষম হয়। এ বছর ৭ মার্চ বাঙালিশ্রেষ্ঠ বঙ্গবন্ধু তার মহাকালজয়ী ভাষণ দেন। ২৬ মার্চ তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত বাংলাদেশ। বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি ও বঙ্গবন্ধু, একসূত্রে গাঁথা তিনটি পবিত্র নাম। আমরা সবকিছু ভুলে যেতে পারি, কিন্তু এই তিনটি নাম কিছুতেই স্মৃতি থেকে মুছে দিতে পারি না। এই তিনটি মহাপবিত্র নাম যে ভুলে যেতে চেষ্টা করে সে আর যা কিছুই হোক বাঙালি হতে পারে না।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রবিবার ছিল। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দশ লক্ষ নিপীড়িত বাঙালির উপস্থিতিতে মাত্র আঠারো মিনিটের এক অনলবর্ষী ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। এই ভাষণ নিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছেন। তাদের সেই ব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে যুক্তিপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের নব্যব্যাখ্যা দান করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি আজ অন্য একটি বিষয়ে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে চাই।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারভুক্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আন্তর্জাতিক দলিলে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত ঐতিহ্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২৭টিতে। আন্তর্জাতিক ৪২৭টি বিষয়ের মধ্যে ছোট্ট বাংলাদেশও একটি বিষয়ের গৌরবদীপ্ত অংশীদার এরচেয়ে আনন্দের সংবাদ আর কি হতে পারে!

কে, কবে, কিভাবে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কোর দৃষ্টিগোচর করেছেন সেই ইতিহাস আমার অজানা। তবে একটি দাবি আমার মনের মধ্যে এখনও জ্বলজ্বল করছে। সেটি হলো দেশবরেণ্য কলাম লেখক, গবেষক ও রাজনীতিক মোনায়েম সরকারের বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যে অন্তর্ভুক্তির দাবি। তার সেই নিবন্ধটি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়। পরে সেটি ২০১৭ সালে প্রকাশিত বাংলা ভাষার রক্তরঞ্জিত ইতিহাসগ্রন্থে স্থান পায়। তার লেখাটি পড়ে মনে হয়েছিল তিনি যেহেতু মুজিবপ্রেমী তাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা প্রদর্শন করছেন। আমার বিশ্বাসই হয়নি এই মূল্যবান ভাষণটি ইউনেস্কো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কিন্তু ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর প্যারিসে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কোর হেড কোয়ার্টার্সে তৎকালীন মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা যখন ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেন তখন মোনায়েম সরকারকে আমি টেলিফোনে অভিনন্দন জানাই। কথা প্রসঙ্গে সেই মুহূর্তেই জানতে পারি প্যারিসে নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলামও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কারণ রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলামও এই নিবন্ধটি পড়েছিলেন এবং উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যে অন্তর্ভুক্তকরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলামও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মোনায়েম সরকারকে বাংলাদেশে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। স্বনামেই তিনি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে পরিচিত। ছাত্রজীবনে তিনি বামপ্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপরে যুক্ত হন বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগে (বাকশাল)। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হলে তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে ভারত গমন  করেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য দেশে-বিদেশে জনমত তৈরির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। যারা মোনায়েম সরকারের আত্মজৈবনিকগ্রন্থটি পাঠ করেছেন নিশ্চয়ই তারা এ বিষয়ে সম্যক অবগত আছেন।

মোনায়েম সরকার ১৯৭৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। আওয়ামী লীগে যুক্ত হয়েই তিনি দলীয় কর্মকা-ের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুসন্ধান ও সেগুলো গ্রন্থভুক্ত করার কাজে মনোযোগী হন। এ পর্যন্ত তিনি একাশিটি গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেন। তার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে বাংলা একাডেমি কর্তৃক দুই খ-ে প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতিএকটি আকর গ্রন্থ। এছাড়া বাঙালির কণ্ঠ’, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’, ‘বাঙালিশ্রেষ্ঠ বঙ্গবন্ধু’, ‘মুজিব মানে মুক্তি’, ‘যেতে হবে বাহাত্তরে’, ‘বাংলা ভাষার রক্তরঞ্জিত ইতিহাস’, ‘শেখ মুজিব : মৃত্যুঞ্জয় ছায়াবৃক্ষবিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মোনায়েম সরকার ২০০১ সাল পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করেছেন কিন্তু কখনো পদ-পদবির জন্য হাহাকার করেননি। তিনি কাজ করতেই ভালোবেসেছেন, বিনিময়ে কিছুই প্রত্যাশা করেননি। আজও চুয়াত্তর বছর বয়সে তিনি দুই হাতে কাজ করে যাচ্ছেন, এখনও তাঁকে প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ করতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না। মোনায়েম সরকার ইউনেস্কোর উদ্দেশ্যে যেই দাবিটি উত্থাপন করেছিলেন, সেই দাবিটি কেমন ছিল তা তার নিবন্ধ থেকেই উদ্ধৃত করতে চাই। মোনায়েম সরকার বলেছেন, ‘আজ আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ঐতিহাসিক সংগ্রাম ইউনেস্কো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় বিভূষিত। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে বঙ্গবন্ধু সোচ্চার ছিলেন এবং তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তারই সুযোগ্য কন্যার নেতৃত্বে বাংলা ভাষা আন্দোলনের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিগণিত হয়। বাংলাদেশের ষোলো কোটি বাঙালি ও পৃথিবীর বাংলাভাষী জনগণের পক্ষ থেকে আজ দাবি জানাতে চাই, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকেও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। যে ভাষণটি একটি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে স্বাধীন জাতিতে পরিণত করেছে, যে ভাষণ বিশ্বের ৫০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যে ভাষণ শুনে এখনও আবেগতাড়িত হয় অবুঝ কিশোররা, সে ভাষণ সঙ্গত কারণেই ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের অংশ হওয়ার দাবিদার। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান পাওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। তাহলে আমাদের দেশ ও জাতি সম্মানিত হবে। মহিমান্বিত হবে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলা ভাষা ও সোনার বাংলাদেশ। (বাংলা ভাষার রক্তরঞ্জিত ইতিহাস, পৃষ্ঠা : ১০৮, পারিজাত প্রকাশনী)।

জাতীয়ভাবে কোনো কিছু অর্জন করতে হলে একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, সম্মিলিতভাবেই তা সম্পন্ন করতে হয়। আমি এ কথা বলতে চাই না যে, মোনায়েম সরকারের দাবির জন্যই ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমি শুধু এটাই বলতে চাই যে, যার বা যাদের দাবির জন্য ইউনেস্কো ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে অসামান্য স্বীকৃতি দিয়েছেন তার বা তাদের মধ্যে মোনায়েম সরকারও একজন দাবি উত্থাপনকারী। আজ যারা ইউনেস্কো ঘোষিত স্বীকৃতির জন্য কৃতিত্ব নিতে চান তাদের মধ্যে মোনায়েম সরকারও কৃতিত্বের দাবিদার।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ইউনেস্কো ঘোষিত স্বীকৃতির জন্য বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে নানারকম কর্মকা- ও কর্মসূচি উদ্যাপন করেছেন। গত ৭ মার্চে (২০১৮) ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সমাবেশও করেছেন কিন্তু যে মানুষগুলোর নিরলস চেষ্টার ফলে এমন একটা গৌরবরঙিন স্বীকৃতি জুটল তাদের সম্মানার্থে কিছু করেছেন বলে আমি জানি না। সরকারের উচিত হবে যারা ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি পেতে কাজ করেছেন তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ দেওয়া, কৃতজ্ঞতা জানানো। হয়তো তারা সকলে প্রাণের টানেই ইউনেস্কোর কাছে দাবি করেছেন, তদবির করেছেন, তবু যদি তাদের কাছে ঋণ স্বীকার করা হয়, সেটাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

বীর বাঙালিহিসেবে বাঙালির যেমন সুনাম আছে, তেমনি পরশ্রীকাতর, অকৃতজ্ঞ বাঙালিহিসেবেও বাঙালির কম দুর্নাম নেই। আমরা মাঝে মাঝে উপকারীর উপকারের কথা ভুলে যাই, অবহেলা করি কর্মী পুরুষের অমূল্য অবদান। অকৃতজ্ঞ মানসিকতা থেকে আজ আমাদের মুক্ত হওয়ার দিন এসেছে। দিন এসেছে কর্মবীরের মহৎকর্মকে সম্মান জানানোর। আশা করি বর্তমান সরকার ইউনেস্কো ঘোষিত স্বীকৃতির আনন্দে স্বীকৃতি প্রাপ্তির নেপথ্য নায়কদের বিস্মৃত হবেন না, বরং তাদের খুঁজে বের করে সম্মান প্রদর্শন করবেন। এই সম্মান তাদের প্রাপ্য। কাউকে তার প্রাপ্য সম্মান দিলে যিনি সম্মান প্রদর্শন করেন তিনিও সম্মানিত হন। 

লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা