মহান মে-দিবস : শ্রমজীবী মানুষের রক্তে ধোয়া দিন

Filed under: জাতীয়,ফিচার |

Source: Internet

সৈয়দ জাহিদ হাসান: পৃথিবীতে দুই জাতের মানুষ আছে। একদল খাদক, অন্য দল খাদ্য। যারা খাদক, তারা চালাক, শক্তিমান, স্থূলদেহী। যারা খাদ্য, তারা নির্বোধ, দুর্বল, কৃশকায়। শক্তিমানরা দুর্বলদের ব্যবহার করে, তাদের রক্তপান করে সীমাহীন ভোগের রাজ্যে বসবাস করে। দুর্বলেরা শক্তিমানের অত্যাচার মেনে নিয়ে মুমূর্ষূ হয়ে জীবন বয়ে বেড়ায়। এই শক্তিমানরা কখনো সাজে প্রভু, কখনো সামন্ত, কখনো পুঁজিপতি। দুর্বলেরা দাস বা শ্রমজীবী হিসেবেই পরিচিত। শক্তিমানরা জোঁকের মতোই রক্তপিপাসু। শ্রমজীবী মানুষের রক্তপান না করলে এরা বাঁচতে পারে না, ফুলেফেঁপে অহংকারী হতে পারে না। সম্পদের আদি উৎস শোষণ। শোষণই সম্পদ বৃদ্ধির একমাত্র পথ। শ্রমজীবীরা এ পথেই তাদের সর্বস্ব হারায়।

মানুষের সমাজে বৈষম্যের অন্ত নেই। বলতে গেলে সমাজের সর্বত্রই বৈষম্য। মানুষ প্রতিনিয়তই চেষ্টা করছে বৈষম্য কমিয়ে এনে সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের, কিন্তু মানুষের চেষ্টা মানুষই ব্যর্থ করে দিচ্ছে। একদল লোক চাচ্ছে, সকল মানুষ সমান সুযোগ পাক, আরেক দল চাচ্ছে, কিছু লোক অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতার মালিক হোক। আদিম সাম্যবাদী সমাজ ভেঙ্গে মানুষ যেদিন সামনের দিকে এগুতে শুরু করে সেদিন থেকেই বৈষম্য পিছু নেয় মানুষের। সেই থেকে চলছে তো চলছেই, এখনও বৈষম্যের রথযাত্রা থামেনি। কখন থামবে কেউই তা জানে না।

মানুষ ক্ষমতা ভালোবাসে, ভালোবাসে সবকিছু নিজের আয়ত্তে রাখতে। ‘সবকিছু আমার হবে’, এই আকাক্সক্ষাই মানুষকে বৈষম্য সৃষ্টি করতে নিরন্তর প্রেরণা যোগাচ্ছে। যেদিন মানুষ তৃপ্ত হবে, ধনাকাক্সক্ষা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করবে শুধু সেদিনই সমাজে সাম্য বা সমতা বিরাজ করবে। এর আগে যত চেষ্টাই করা হোক, কোনো চেষ্টাই মানুষের সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। ‘ধনে সুখ নেই’, এমন কথা দীর্ঘদিন ধরেই সমাজে প্রচলিত, কিন্তু এই বাক্যে কেউ পুরোপুরি বিশ্বাসী নয়, তা-ই যদি হতো তাহলে পৃথিবীর মানুষ ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ার জন্য এত অস্থির হবে কেন? কেন তারা লুণ্ঠন ভালোবাসবে? আসল কথা হলো, মানুষ স্বভাবতই ভোগ-বিলাসিতা কামনা করে। এসব না পেলেই হয় মনকে মিথ্যা প্রবোধ দিয়ে সান্ত¦না দেয়, নয়তো শক্তি প্রদর্শন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। দুর্বলেরা উট পাখির মতো  মাথা গুঁজে থাকে, শক্তিমানরা সিংহের মতো এগিয়ে যায়। পৃথিবীর দিকে তাকালে এমনটাই দেখা যায়। যুগান্তরের ইতিহাস মূলত এমনসব ঘটনা দিয়েই পরিপূর্ণ।

গত বছর প্রেসক্লাবের সামনে (২০১৭) মে-দিবসের সমাবেশে একটি স্লোগান দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। একজন পোশাক শ্রমিকের হাতে একটি প্লাকার্ডে লেখা ছিল, ‘মালিক শ্রমিক ভাই ভাই / মোদের কোনো দ্বন্দ্ব নাই।’ আমি ভাবতেই পারি না এমন সর্বনাশী স্লোগান কি করে দেয় এদেশের বঞ্চিত শ্রমিক সমাজ? যে সমাজে এখনও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যে সমাজে এখনও একজন শ্রমিক কোনো রকমে বেঁচে থাকে, সেই সমাজের শ্রমিক কিভাবে বলে, ‘মালিক-শ্রমিক ভাই ভাই’? কে এই স্লোগান সৃষ্টি করল, কেন করল তা শ্রমিকদের ভেবে দেখা দরকার। এই স্লোগান সর্বহারাদের স্লোগান কিছুতেই হতে পারে না, কেননা এর মধ্যে লুকিয়ে আছে শ্রমিকদের শোষণ করার, প্রতারণা করার কৌশল। এই প্রতারণার কৌশল যতদিন না এদেশের শ্রমিক ছিন্ন করার সাহস দেখাবে, ততদিন কিছুতেই শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না।

আজ অনেক অর্থনীতিবিদও বলেন, শ্রমিকের জীবনমান উন্নত হয়েছে, তাদের উপার্জন বৃদ্ধি হয়েছে। এ কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কেন? কেন চারদিকে এত হাহাকার, নিরন্ন মানুষের এত আহাজারি? রাস্তা-ঘাটে এত অনাথ-অসহায় মানুষের ভিড় কেন? কেন আজও বস্তির পর বস্তি হচ্ছে। কারা বাস করছে, বস্তি নামক রোগ-ব্যাধির মৃত্যুপুরীতে? পুঁজিপতিদের টাকায় করা জরিপে যেসব তথ্য উঠে আসছে তা-ই যদি শ্রমিকদের বিশ্বাস হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের  দেশের শ্রমিকরা আজও বোকার স্বর্গে বসবাস করছে। তাদের এই ভ্রান্তি দূর করার জন্য দরকার যথার্থ শিক্ষা ও চিন্তার বিকাশ। আমাদের দেশের শ্রমিকরা বেশির ভাগই অশিক্ষিত ও নির্বোধ। এদের সহজেই ধোকা দিয়ে বোকা বানানো যায়। এরা আগেও বোকা ছিল, এখনও তাই আছে। যতদিন না এরা পুঁজিপতিদের চালাকি ধরতে পারবে, ততদিন এরা শুধু ঠকেই যাবে। মে-দিবসের চেতনা শুধু শ্রমঘণ্টা কমানোর চেতনাই নয়, সেই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নত করার আকাক্সক্ষাও জড়িত। 

একটি বিষয় লক্ষণীয়, পৃথিবীর সবকিছুই শ্রমিকের শ্রমে-ঘামে গড়া কিন্তু কিছুতেই শ্রমিকের কোনো অধিকার নেই, এমনকি তাদের নামও কোথাও লেখা থাকে না। যারা হাল চষে, মোটর চালায়, অট্টালিকা তৈরি করে, দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরি করে সুন্দর সরণি, ধরণীর বুকে তাদের চেয়ে বঞ্চিত আর কেউ নয়। এই শ্রমজীবী মানুষেরাই মজুর, মুটে, কুলি হয়ে পৃথিবীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সৃষ্ট সভ্যতায় যোগ করছে নতুন মাত্রা, নতুন ইতিহাস। শ্রমজীবী মানুষকে পায়ের তলায় রেখে যারা ঊর্ধ্বলোকে বসবাস করতে চায়, তারাই মানুষের প্রধান শত্রু, বিশ্বমানবতার বৈরী। সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় বলেছেন,

                ‘তুমি শুয়ে র’বে তে-তলার ’পরে, আমরা রহিব নীচে,

                অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে।’

কবি নজরুলের উচ্চারিত কথার প্রতিধ্বনিই হোক শ্রমিকশ্রেণির স্লোগান। অত্যাচারী পুঁজিপতিদের সঙ্গে আপস নয়, তাদের চূড়ান্ত আঘাত করে সুন্দর ও মানবিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠাই হোক মে-দিবসের অঙ্গীকার।

একজন অশিক্ষিত, মোটা বুদ্ধির শ্রমিকের পক্ষে মে-দিবসের চেতনা উপলব্ধি করা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। মে-দিবসে শাসক গোষ্ঠীর পোষা পুলিশের গুলিতে নিষ্পাপ শ্রমিকের রক্ত ঝরেছিল। বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতা ফাঁসিতেও ঝুলেছিলেন। ১৮৮৬ সালে শিকাগো শহরের শ্রমিক আন্দোলন কোনো সামান্য ঘটনা নয়, এই আন্দোলন শ্রমিকের অধিকার পুরোপুরি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী চলতেই থাকবে। মে-দিবস কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলের নির্দিষ্ট শ্রমজীবীদের জন্যও প্রযোজ্য নয়, এ দিবস সর্বহারা সব মানুষের জন্যই। শুধু লাল পতাকার মিছিল আর মুখস্ত স্লোগানে মে-দিবসের অনুষ্ঠান সীমাবদ্ধ হলে মে-দিবসের গৌরব ম্লান হয়ে পড়ে। মে-দিবস শোষিত শ্রমিকের সাহস সঞ্চারের দিন। পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে শ্রমের ন্যায্য হিসাব ও মূল্য বুঝে পাওয়ার দিন। যতদিন পৃথিবীর শ্রমিকেরা এই কথাটা না বুঝবে ততদিন মে-দিবসের শহিদেরা আমাদের অভিসম্পাত করবে। তাদের অভিসম্পাত থেকে মুক্তি পেতে হলে দুনিয়ার মজদুরকে এক হয়ে লড়তে হবে। মুক্ত করতে হবে সা¤্রাজ্যবাদীদের তালাবদ্ধ সিন্দুকে আটকে পড়া সাম্যের দেবতা। সাম্য প্রতিষ্ঠাই হোক শ্রমজীবী মানুষের ও মে-দিবসের সংগ্রামের মূলমন্ত্র।

লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।