জোট ও ভোটের রাজনীতি

Filed under: জাতীয়,ফিচার |

মোনায়েম সরকার: বর্তমানকালের রাজনীতিতে একটি বিষয় লক্ষণীয় তাহলো, সমমনা দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন। জোট ছাড়া আজকাল ভোট হয় না বলেই মনে হচ্ছে। উন্নত দেশ হোক আর অনুন্নত দেশ হোক সবখানেই এখন জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে লড়ছে রাজনৈতিক দলগুলো। একটি দল যতই উন্নয়ন করুক, মানুষের জন্য যত ভালো কাজই করুক না কেন, তবু নির্বাচন করতে হলে তাদের মনে দুশ্চিন্তা জাগে জয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে। বাংলাদেশে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ভারতবর্ষের বিজেপি ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন, জার্মানির বর্তমান ক্ষমতাসীন অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও জোটবদ্ধ নির্বাচনেরই ফসল। অর্থাৎ প্রাচ্য বলি আর প্রতীচ্য বলি, সবখানেই জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের রেওয়াজ চালু হয়েছে। এটা এক অর্থে ভালো লক্ষণ, আবার আরেক অর্থে খারাপও বটে। ভালো এই অর্থে যে শরিক দলের চাপে নির্বাচিত সরকার যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারে না। তাদেরকে সব সময় একটি সতর্ক অবস্থার মধ্যে থাকতে হয়। উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজ করতে হয়। জোটের খারাপ দিক হলো, যেসব দলের ১ শতাংশও ভোট নেই, এককভাবে নির্বাচন করলে যাদের পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা শত ভাগ, সেসব ছোট দলকেও অনেক সময় বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। ক্ষমতার ভাগ দিয়ে তাদের বশে রাখতে হয়। শরিক দলের প্রেসারে বৃহৎ দলটি সারাক্ষণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকে। ছোট ছোট দলের নেতাদের ব্যর্থতাও বড় দলটিকে বহন করতে হয়। ছোট দলের কর্মকা-ের দায়ভার বড় দলের ঘাড়ে এসে পড়ে।

আমি বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে কথা না বলে আজ বাংলাদেশের জোট ও ভোটের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চাই। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এককভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যেসব জেনারেল ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তাদের নেতৃত্বে যে দল গঠিত হয়, সেসব দলও বিপুল সংখ্যক আসন নিয়ে এককভাবে সরকার গঠন করে। গণআন্দোলনের ফলে জেনারেলদের যুগের অবসান হয়ে গণতান্ত্রিক ধারায় এগুতে থাকে বাংলাদেশ। গণতান্ত্রিক ধারায় এগুনোর মুহূর্তেই জোটের রাজনীতি শুরু হয় বাংলাদেশে। সেই ধারা এখনো বর্তমান। কেন বাংলাদেশে জোটনির্ভর রাজনীতি চলছে? কেন একটি দল এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পারছে না, সেসব বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেক পেছনের ইতিহাস ধরে টান দিতে হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পরে যে দুটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল সেগুলো ছিল কৃত্রিম ও জনবিচ্ছিন্ন দল। ক্ষমতায় আসীন থাকাকালে জেনারেল জিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিএনপি আর পরবর্তীকালে  জেনারেল জিয়ার ভাবশিষ্য জেনারেল এরশাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাতীয় পার্টি। বিএনপি মূলত রাজাকার, আলবদর, আল শামস, ন্যাপ, সুবিধাবাদীদের নিয়ে গঠিত পাকিস্তানি নীতি-আদর্শে বিশ্বাসী পার্টি। ক্যান্টনমেন্টের অন্ধকার কুঠুরিতে জন্ম নেয়া এই দলটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য শুধু হুমকি নয়, বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই এরা বিশ্বাস করে না। বিএনপি জোটবদ্ধ না থাকলে তাদের পক্ষে আর ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যারা জানেন, তারা নিশ্চয়ই মনে করতে পারেন পঁচাত্তর পরবর্তী জিয়া সরকার ছিল অবৈধ। এই অবৈধ জিয়া সরকার সারাদেশে সৃষ্টি করেন এক দুর্বিষহ আতঙ্ক। তার সীমাহীন নির্যাতনে জেলখানা ভরে যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী দ্বারা। কেউ কেউ চলে যান আন্ডার গ্রাউন্ডে। আন্ডার গ্রাউন্ডেও যখন সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়, তখন তারা বাধ্য হয় হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে দেশ ত্যাগ করতে। জিয়ার কূটবুদ্ধিতে আওয়ামী লীগ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। দুর্বল হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম। দুর্বল আওয়ামী লীগকে উঠে দাঁড়াতে জোট গঠন করা একটি রাজনৈতিক কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

জিয়ার পরে আসে আরেক জেনারেল এরশাদ। এরশাদও আওয়ামী লীগের নেতৃকর্মীদের ওপর ভয়ঙ্কর নির্যাতন চালায়। তাই আওয়ামী লীগকে নির্যাতন করতে জিয়া ও বিএনপি যা যা করেছে, এরশাদ আর জাতীয় পার্টিও তা-ই করেছে। বরং এরশাদের নির্যাতন কোথাও কোথাও জিয়াকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জনগণের প্রিয় পার্টি আওয়ামী লীগ ২৮৮টি আসন পায়, ভোট পায় ৮৯ শতাংশ। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ পায় ২৯৩টি আসন, ভোট পায় ৭৩ দশমিক ২০ শতাংশ। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জেনারেল জিয়া প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পায় ২০৭টি আসন এবং ৪১ দশশিক ১৬ শতাংশ ভোট আর আওয়ামী লীগ পায় ৩৯টি আসন এবং ২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ ভোট। এখানে লক্ষ্য করার মতো একটি ব্যাপার হলো, ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পূর্বেও যে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল ৭৩ দশমিক ২০ শতাংশ, তার মৃত্যুর পরে তার ভোটার সংখ্যা কিভাবে ২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে যায় আর হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা সেনাশাসক জেনারেল জিয়ার বিএনপি পায় ৪১ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট তা একটু ভেবে দেখা দরকার।

১৯৮৬ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে যে নির্বাচন হয় সেই নির্বাচন বিএনপি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সরে দাঁড়ায় এবং খালেদা জিয়া তথাকথিত আপসহীন নেত্রীতে পরিণত হন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ঠেকাতে ৪৮ ঘন্টা মিডিয়া ক্যু করে জাতীয় পার্টি নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেয়। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩টি আসন, ভোট পায় ৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ। মিডিয়া ক্যু না হলে নির্বাচনের ফলাফল আওয়ামী লীগের পক্ষেই যেতো। একটি কথা না বলে পারছি না, সেটা হলো এখন যেসব সুজন-কুজন করছেন তারা তখনও ছিলেন, কিন্তু আর্মির ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন, তখন সাহস করে একটি কথাও বলেননি। ১৯৮৮ সালে আবার এরশাদের অধীনে নীল নকশার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউই অংশ নেয়নি। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন, ভোট পায় ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফ্রিডম পার্টি তথা কিলার পার্টি পায় ২টি আসন আর আ স ম আবদুর রব ১৯টি আসন পেয়ে বিরোধী দলীয় নেতা হন। একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার যে, সেনাশাসকেরা যাদেরকে পছন্দ করেছেন তাদেরকেই হয় তাদের দলে নিয়েছেন, নয়তো বিরোধী দল বানিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিঘœ হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তৈরি হয়েছে ছোট ছোট ব্যক্তিপ্রধান দলের। এই ছোট দলগুলোই পরে বৃহৎ দলের ঘাড়ে চড়ে বসে।

১৯৯১ সালে সর্বদলীয় রাজনৈতিক পার্টির অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে বিএনপি পায় ১৪০টি আসন, আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন এবং জাতীয় পার্টি পায় ৩৫টি আসন। এই নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা বিশ্লে¬ষণ করে দেখা যায় বিএনপির বাক্সে পড়ে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট আর আওয়ামী লীগ পায় ৩৩ শতাংশ ভোট, জাতীয় পার্টি পায় ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ ভাট। জামায়াত পায় ১৮টি আসন। জামায়াত-বিএনপির সিট এলাইন্সের ফলে বিএনপি ১৯৯১ সালে অপ্রত্যাশিতভাবে সরকার গঠন করে।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আবার এসে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিজের অধীনে আয়োজন করে ষড়যন্ত্রের নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি পায় ২৭৮টি আসন, ফ্রিডম পার্টি পায় ১টি এবং স্বতন্ত্র পার্টি পায় ১০টি আসন। কিন্তু খালেদা জিয়া গণ-আন্দোলনের মুখে শেষ রক্ষা করতে পারেন নি। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে বাধ্য হন।

এই নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন এবং ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে একুশ বছর পরে অর্থাৎ পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরে ক্ষমতায় আসীন হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি পায় ১৯৩টি আসন এবং ৪০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ভোট, আওয়ামী লীগ পায় ৬২টি আসন এবং ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ এই নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রায় সমসংখ্যক ভোট পেলেও আসন সংখ্যায় বিএনপি এগিয়ে থাকে। এবারও জামায়াতকে সাথে নিয়ে জামায়াতের ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ ভোট নিয়ে এবং ১৭টি আসন নিয়ে বিএনপি এগিয়ে যায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করে বিএনপি আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার নানামুখী ষড়যন্ত্র করে, রাজাকারদের মন্ত্রী বানায়, বাংলা ভাই সৃষ্টি করে এবং দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটায়। বিএনপির রক্তলোলুপ চক্রান্তে নিহত হতে তাকে আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী। শেখ হাসিনাও বহুবার মৃত্যু ঝুঁকি থেকে বেঁচে যান।

বিএনপি ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে যেমন ক্ষমতা ছাড়তে চায়নি তেমনি ২০০১ সালে ক্ষমতা পেয়েও তারা মেয়াদ পূর্ণ করে ক্ষমতা ছাড়তে টালবাহনা শুরু করে। এরপর আবির্ভূত হয় আর্মি সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারাও দুই বছর গণতন্ত্রকে জিম্মি করে রাখে। চেষ্টা চালাতে থাকে দুই নেত্রীকে মাইনাস করার। কিন্তু গণ-আন্দোলনের মুখে তারাও বাধ্য হয় ২০০৮ সালে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে এবং মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করে। দেশে এখন সেই ধারাই অব্যাহত আছে। উপরের বিশে-ষণ থেকে একটি বিষয় প্রতীয়মান হয়েছে যে, যখনই বাংলাদেশে অবাদ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে তখনই আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীণ জোট জয়ী হয়েছে। এ ধারা ১৯৭০ থেকে শুরু হয়ে ২০১৪ পর্যন্ত বিদ্যমান।

দুঃসময়ে জোট গঠন করেন নির্বাচন করতে হয় বলে চিরদিনই জোটের মুখের দিকে চেয়ে থাকলে ভুল হবে। জোটবদ্ধ হয়ে থাকলে একটি দল কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। তাদের রাজনৈতিক ও দলীয় শক্তি জনতার সামনে প্রদর্শন করতে পারে না। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের আমলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে তারা একটি সবল দল। শুধু জোটের শক্তিতে ভর করে নয়, প্রয়োজনে তাদের একলা চলনীতিও গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে আরো জোরদার করা। ২০০ আসন নিশ্চিত না করে আওয়ামী লীগের বিশ্রাম নেওয়া ঠিক হবে না। যেভাবে ২০০ আসন নিশ্চিত করা যায় সেই পরিকল্পনাই আওয়ামী লীগ গ্রহণ করতে হবে এবং এটা ধরে রাখতে হবে। দলীয় ভিত মজবুত হলে আওয়ামী লীগের একার পক্ষে ২০০ আসন পাওয়া মোটেই কোনো কঠিন কাজ নয়। আওয়ামী লীগের উচিত হবে ছদ্মবেশী, পল্টিবাজ শরিক দলের উপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে আগামী নির্বাচনে দলের সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম বেগবান করে ২০০ আসনের লক্ষ্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

১৭ জুলাই, ২০১৮

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।