আজ আমি ক্ষমার বিপক্ষে

Filed under: জাতীয়,ফিচার |

Source: Internet

সৈয়দ জাহিদ হাসান: যার কিছু নেই, তার হারাবার ভয়ও নেই, কিন্তু যার কিছু আছে হারাবার ভয় তার জন্য খুবই বেদনার, মৃত্যুযন্ত্রণার মতোই পীড়াদায়ক। বাংলাদেশ এক সময় গরিব ছিল, সম্পদ ও সম্মানহীন ছিল। একজন ভবঘুরে নিঃস্ব মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা তখন অনায়াসেই দেওয়া যেতো। বিশ-পনেরো বছর আগের বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশ কোনো ভাবেই সমমর্যাদার, সমউচ্চতার নয়। দুই বাংলাদেশের পার্থক্য আলো-অন্ধকারের, শান্তি-সন্ত্রাসের, সমৃদ্ধি ও সম্পদহীনতার। চিরপরাজিত মানুষ যখন একবার বিজয়ী হওয়ার সুযোগ পায় সে ঐতিহাসিক বিজয় তার মধ্যে এই স্বপ্ন সৃষ্টি করে যে, চেষ্টা করলেই বিজয়ী হওয়া সম্ভব, তখন তা পরাজিত করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ছুটে চলার গতি, বাংলাদেশের উচ্চাশা ও সীমাহনি স্বপ্ন, বাংলাদেশকে যে মানসিক শক্তিদান করেছে, এই শক্তি বিনষ্ট হলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ অসুস্থ-পঙ্গু ঘোড়ার মতো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে। ব্যাহত হবে বর্ণিল জীবনের বহু বাসনা। তিমির এসে ঢেকে দেবে এর আলোর দিগন্ত, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির সুবর্ণপদ্ম নয়, এদেশের প্রান্তরে প্রান্তরে পড়ে থাকবে মানুষের লাশ, মনুষ্য রক্তের হোলি খেলায় চাপাতি হাতে নেমে পড়বে রক্তপায়ী বিকট জল্লাদ। পাখির কূজন নয়- ধর্ষিতার আর্তস্বরে ভরে উঠবে বাংলার বাতাস।

চারদিকে আজ পাপ স্বীকারের উৎকট উৎসব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্ষমতায থাকতে যাদের হাতের মুঠোয় লেগে থাকতো নিষ্পাপ মানুষের রক্ত, এখনো যাদের বিষদাঁতের ফাঁকে ফাঁকে লেগে আছে কুমারীদেহের থোকা থোকা মলিন মাংস, তারা আজ ক্ষমা চাচ্ছে পূর্বপাপের। তারা আজ সৎ মানুষের মুখোশ পরে হাঁটু গেড়ে বসেছে ফুটপাতে, রাজপথে, মঞ্চের মিলন মেলায়। এই সব চিহ্নিত পাপীদের পাপস্বীকার যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, ক্ষমা চেয়ে চেয়ে এদের মুখ থেকে যতই কৃত্রিম রক্ত ঝরে পড়ক না কেন, আমি আজ ক্ষমার বিপক্ষে দাঁড়ালাম। এই মুহূর্তে ক্ষমা করা মানেই জেনে শুনে নিজের সর্বনাশ করা। জেনেশুনে শত্রুর হাতে জীবনবিনাশী বিষপান করার কোনোই মানে নেই। আমি কিছুতেই চিহ্নিত ঘাতকের হাতে অকারণে জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নই। আজ আমাকে যে যা-ই বলুক না কেন, স্বাধীকারের প্রশ্নে কিছুতেই আমি ক্ষমাশীল হতে পারি না। যে ক্ষমা মৃত্যু ডেকে আনবে, সমাজে জন্ম দেবে সীমাহীন সন্ত্রাস; যে ক্ষমতায় কবিতা মৃত্যুবরণ করবে, সংস্কৃতির হাতে-পায়ে জড়িয়ে যাবে শয়তানের সুকঠিন শৃঙ্খল, সে ক্ষমার পক্ষে আমি কিছুতেই অবস্থান নিতে পারি না।

বাংলাদেশ কোমল মাটির দেশ। এদেশের বাগানে বাগানে ফোটে কোমলকুসুম। পাখির কোমল গানে, কোমল নারীর ভালোবাসায়, বাংলার প্রতিটি গৃহে আজ রচিত হচ্ছে স্বর্গসুখ। এই স্বর্গসুখে হানা দিতে দিকে দিকে তৈরি হচ্ছে শোষণযন্ত্র। এই শোষণ যেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাজের বুকে বৈধতা লাভ করবে, তার পোশাকি নাম নির্বাচন। আগামী নির্বাচন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য জীবন-মরণ পরীক্ষার মুহূর্ত। ওই নির্বাচন নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। আজ কারো মিষ্টি কথায়, কিংবা মোলায়েম স্পর্শে ভুলে গেলে চলবে না। আবেগকে সুকৌশলে শাসন করে ধীরে-সুস্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ব্যক্তিস্বার্থকে বলি দিতে হবে সামষ্টিকস্বার্থ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। মুহূর্তের লাভালাভের হিসাব-নিকাশ অস্বীকার করতে হবে আগামীর সুন্দর সময়ের জন্য। এ কাজে এখন আলস্য প্রদর্শন করলে নৈতিক অপরাধ সংঘটিত হবে। যে পাপ ধুয়ে-মুছে গেছে শহীদের রক্তিম শিশিরের ফেনায়, যে পাপী শাস্তি পেয়েছে উন্মুক্ত বিচার সভায়, সেই পাপ ও সেই পাপী আবার আমাদের জীবনে, সমাজে-রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা আমি কিছুতেই চাই না।

নিন্দুকের মুখে চুলকালি মাখিয়ে বিজয়ীর দৃপ্ত অহংকারে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ; আমাদের ষোলো কোটি মানুষের শান্তিময় বাংলাদেশ। আমাদের এই বিজয়রথ নির্বিঘেœ আরো বহুদূর এগিয়ে যাক, সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এই মাটিতে জন্ম নেওয়া কিছু মাতাল দেশদ্রোহী এদেশের উত্থান চায় না, এ দেশের মানুষের শান্তি ও উন্নতি চায় না। এরা এদেশে ভিনদেশি প্রভুদের জনবিরোধী নির্দেশনামা কায়েম করতে চায়, অগ্রগতির মস্তকে চাপিয়ে দিতে চায় মধ্যযুগের অচলস্বপ্নের বোঝা। এরা গোপন কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সোনার বাংলায় শ্মশান নির্মাণের জন্য। মিলনসংগীতে এরা যোগ করতে চায় বিষাদের করুণকাহিনী, রাখীবন্ধনের পরিবর্তে এরা বাঙালির হাতে হাতে পরিয়ে দিতে চায় লৌহশৃঙ্খল। এরা এখন ক্ষমতার বাইরে গিয়ে অসীম অতৃপ্তিতে ভুগছে। এদের চিন্তাতপ্ত ললাটে লোভের তৃতীয় নয়নে যে হিংসাবহ্নি বর্ষিত হচ্ছে সেটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। পরাজিত শত্রুকে বিজয়ীর আসনে অধিষ্ঠিত করে তাকে নির্বিচার হত্যার অধিকার দিলে আমাদের ভুল হবে, আমাদের আজ ভেবে দেখা দরকার, আমরা সেই ভুলটাই আজ করতে যাচ্ছি কিনা।  

কবিগুরু একটি কবিতায় বলেছেন,

ভীমরুল মৌমাছিতে হল রেষারেষি,

দুজনায় মহাতর্ক শক্তি কার বেশি।

ভীমরুল কহে, আছে প্রমাণ

তোমার দংশন নহে আমার সমান।

বাঙালির সামগ্রিক জীবন আটকা পড়েছে ভীমরুল আর মৌমাছির বলয়ে। আমরা বরং মৌমাছিকে ভালোবাসতে পারি কিন্তু ভীমরুলকে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। মৌমাছি হুল ফোটালেও মধু দেয়। পক্ষান্তরে হত্যা ছাড়া ভীমরুলের দেবার কিছু নেই। অনেক রক্ত¯্রােত পেরিয়ে, ষড়যন্ত্রীদের ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে শুভকর্মপথে যে আজ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সে পথ থেকে বাংলাদেশের গতিমুখ ফেরানো মোটেই সমীচীন নয়। এখন কোনো ক্ষমা নয়। সহমর্মিতা বা করুণা প্রদর্শন নয়। এখন আমাদের নিজেদের স্বার্থেই নির্মম হওয়া দরকার। যে দুর্দমনীয় শত্রু  দুর্বল হয়ে পড়েছে এখনই সুযোগ তাকে আরো দুর্বল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। ব্যাধিকে বাড়তে দিয়ে স্বেচ্ছায় রোগভোগ বোকারাই করে। দেশপ্রেমের নামে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা বাস্তবায়নের নামে, আমার পরবর্তী প্রজন্মের সুখী জীবনের নামে, আজ আমি ক্ষমার বিপক্ষে দাঁড়ালাম। আমাকে ক্ষমা করো, স্বদেশ। 

লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

 

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।