অ্যাশেজ : ইংল্যান্ডের হ্যাট্রিক

Filed under: ফিচার,সময়ের খেলা |

অ্যাশেজ২২

অ্যা লিস্টার কুকের হাত ধরে যেন স্বর্ণসময় অতিবাহিত করছে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। তিন দশকের বেশি সময় পর ঐতিহ্যের অ্যাশেজ সিরিজ জয়ের হ্যাটট্রিক করে সে স্বাক্ষরই রেখেছে ক্রিকেটের জনকরা। ১৯৮১ সালের পর প্রথমবারের মতো টানা তৃতীয় অ্যাশেজ ট্রফি ঘরে তুলেছে ইংলিশরা। ৩২ বছর আগের এজবাস্টনের রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি হয়েছে চেস্টার লি স্ট্রিটে।

ইংলিশ ক্রিকেটে যেন ইতিহাস সৃষ্টির জন্যই এসেছেন অ্যালিস্টার কুক। সেটি আবার প্রমাণ করেছেন তিনি। প্রথম দুই টেস্ট জয়ের পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে বৃষ্টিবিঘিœত টেস্ট ড্র হয়। তারপর সামান্য হলেও একটা শঙ্কা কাজ করেছে ইংলিশ শিবিরে। শেষ দুটি ম্যাচ অস্ট্রেলিয়া জিতে গেলে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। এমন লক্ষ্যের কথা জানিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। অবশ্য অ্যাশেজ সিরিজ ড্র হতে পারে এমন আশঙ্কা পাত্তাই দেয়া হয়নি ইংলিশ শিবির থেকে। অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুক জানিয়েছিলেন সিরিজ জয়ের জন্য অপেক্ষার প্রহরটা শেষ পর্যন্ত টানতে চান না। চেস্টার লি স্ট্রিটেই সিরিজ জয়ের কাজটা সেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। অবশেষে সেটিই করেছেন কুক বাহিনী। গত ১২ আগস্ট চতুর্থ টেস্টের চতুর্থ দিনেই ৭৪ রানের জয়ে সিরিজ নিশ্চিত করে স্বাগতিক ইংল্যান্ড। অর্থাৎ এক ম্যাচ হাতে রেখেই ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের দখলে রেখেছে ইংলিশরা।

সিরিজ না খোয়ানোর মিশনে দ্বিতীয় ইনিংসে জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ২৯৯ রান। কিন্তু ২২৪ রানে গুটিয়ে যায় অসিরা। প্রথম ইনিংসে সফরকারিদের সংগ্রহ ছিল ২৭০ রান। আর দুই ইনিংসে বিজয়ী ইংলিশরা করে ২৩৮ ও ৩৩০ রান। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ের পথে ১১ (৫+৬) উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন বিজয়ী দলের পেস তারকা স্টুয়ার্ট ব্রড। যে কারণে দুরন্ত ব্রডকে স্তুতির বন্যায় ভাসান দলপতি অ্যালিস্টার কুক। ব্রডের বিধ্বংসী বোলিংয়ের কারণে বিফলে যায় প্রতিপক্ষ ওপেনার ক্রিস রজার্সের সেঞ্চুরি ও পেসার রায়ান হ্যারিসের ৯ (২+৭) শিকার। ম্যাচ ও সিরিজ হারে হতাশা প্রকাশ করেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। প্রথম দুই টেস্ট যথাক্রমে ১৪ ও ৩৪৭ রানে জিতে ইংল্যান্ড। বৃষ্টিবৃঘিœত তৃতীয় টেস্ট ড্র হয়। ওভালে পঞ্চম ও শেষ টেস্ট হয়েছে ২১ থেকে ২৫ আগস্ট

ashes22এ নিয়ে পর পর তিন অ্যাশেজ সিরিজ জিতে নিয়েচে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের তৃতীয় স্থানে থাকা দূর্বার ইংল্যান্ড। ২০০৯ সালে ঘরের মাটিতে ২-১, ২০১০-১১ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৩-১ এবং এবার নিজেদের আঙিনায় ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে সিরিজ জয়। চতুর্থ টেস্টে ২৯৯ রানের জয়ের লক্ষ্যে এক পর্যায়ে ১ উইকেটে ১৪৭ রান করে ফেলে অস্ট্রেলিয়া। হাতে ৯ উইকেট ও প্রায় দেড় দিন, প্রয়োজন দেড়শর মতো রান। ব্যাট হাতে সেরা ভরসা স্বয়ং অধিনায়ক ক্লার্কের উইকেট অক্ষতÑএতগুলো পয়মন্ত বিষয় দেখার পর অসি ভক্তরা আশায় আচ্ছন্ন হতেই পারেন। ট্রফি উদ্ধারের স্বপ্ন হয়ত আগেই শেষ, কিন্তু সিরিজ না হারার প্রথম ধাপটা তো অন্তত শুরু করা যাবে! এত ভাল জয়ের মঞ্চ আগের তিন টেস্টে পায়নি অতিথিরা। কিন্তু পরের ২১ ওভারেই বদলে যায় দৃশ্যপট।

বলা ভাল ব্রড তান্ডবে অন্ধকারের গহীনে তলিয়ে যায় ক্লার্কের ব্যাটিং বহর। ১৪৭/১ থেকে ২২৪ রানে গুড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া! এক সময় প্রতিপক্ষের ওপেনিং জুটি ভাঙতে যেখানে ঘাম ঝড়ছিল, সেখানে ব্রডের নামের পাশে ৬ উইকেট। ইংল্যান্ডের হারের বদলে জয়, ম্যাচ শেষ চতুর্থ দিনেই। কুক বাহিনী যে কেবল চতুর্থ টেস্ট জিতে সিরিজ করায়ত্ব করেন নি, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের হালের কদর্য চেহারাটাকেও বের করে আনেন আরও একবার। আরো একবার ক্লার্কের মুখের দিকে তাকানো যচ্ছিল না। ম্যাচ শেষে বৃটিশ ক্রিকেটাররা যখন উন্মাতাল উল্লাসে মত্ত, টিভি ক্যামেরা আচমকাই ধরল ক্লার্কের মুখ। বিধ্বস্ত, অবসন্ন চেহারা। যেন টেস্ট শেষ হওয়ার পরও বিশ্বাস করতে পারছেন না। এত ভাল অবস্থায় থাকা ম্যাচে মেনে নিতে পারছেন না হার। ক্লার্ক (২১) বোল্ড হওয়ার পরই অস্ট্রেলিয়ার শেষের শুরু।

রজার্স, উসমান খাজা, ডেভিড ওয়ার্নার আউট হওয়ার পরও হয়ত অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ থেকে সরে যায়নি। কিন্তু ব্রড ঝড়ে একটা সময় মাত্র ১৩ রানের ব্যবধানে উড়ে যায় পাঁচ ব্যাটসম্যানের প্রাণ! ব্রড বিষ্ফোরন ১৮.৩-৩-৫০-৬! তাতেই সলিল সমাধি। এর মধ্য দিয়ে ৬১ টেস্টে ২১২ উইকেট শিকার করেছেন গ্ল্যামার ইংলিশ পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড।

সিরিজ নিশ্চিত করা ম্যাচ শেষে বিষন্ন বদনে অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক ক্লার্ক বলেন, ‘দারুণ একটা ম্যাচ শেষ পর্যন্ত বাজে ব্যাটিংয়ের  জন্য হেরে গেলাম। তবু বলব আমরা একেবারে জঘন্য খেলিনি। এখানে রজার্স, হ্যারিস তাদের কোয়ালিটির স্বাক্ষর রেখেছে। চেস্টার লি স্ট্রিটে অনেকে কিছুই শিখলাম আমরা!’ আরে কবরে গিয়ে শিখে আর লাভ কি? তাই তো মহা খেপা খেপেছে অস্ট্রেলিয়া গনমাধ্যম। বিভিন্ন মিডিয়ায় কচুকাটা করা হচ্ছে ক্লার্ক ও তার দলকে। বিপরীতে ইংলিশ মিডিয়ায় জাতীয় বীরের মত সম্মান জানিয়ে প্রশাংসায় ভাসানো হচ্ছে কুকদের । অনেক পত্রিকার প্রথম পাতায় নায়ক স্টুয়ার্ট ব্রড ও দলের উল্লাসের ছবি দিয়ে লিড নিউজ করা হয়েছে।

 

 

তৃতীয় টেস্ট, ওল্ডট্রাফোর্ড, ১-৫ আগস্ট  

বৃষ্টিতে ড্র ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের তৃতীয় টেস্ট

অসিদের ‘বর’ হতে ক্রিকেট বিধাতাও বুঝি দ্বিধান্বিত! নইলে প্রথম দুই টেস্টে নির্বিঘেœ ইংল্যান্ডকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়ার পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে কেন এমনটা হবে। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া অস্ট্রেলিয়ার সিরিজে টিকে থাকতে জয় কিংবা ড্রয়ের বিকল্প ছিল না। দু’ দুটি আত্মসমর্পনের পর এই প্রথম গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছিল মাইকেল ক্লার্কদের দল। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে প্রতিটি ইনিংস, এমনকি প্রতিটি দিনেও এগিয়ে ছিল সফরকারীরা। কিন্তু বাধ সাধে বৃষ্টি। পঞ্চম ও শেষ দিনে জয়ের জন্য স্বাগতিক ইংলিশদের প্রয়োজন ৩২২ রান। টেস্টের ইতিহাস বলে চতুর্থ দিনে তা বেশ দূরহ। তার ওপর ২০.৩ ওভারে ৩ উইকেট নেই অ্যালিস্টার কুকদের। দারুণ এক সপ্নের হাতছানিই ছিল অতিথিদের সামনে। কিন্তু অসিদের সে স্বপ্ন পুরণে বাঁধ সাধে বৃষ্টি। নইলে হয়ত ফলটা ২-১ ব্যবধানে নামিয়ে আনতে পারত ক্লার্কের দল। ম্যাচ শেষে তাই কোনোরকম ভনিতা না করে প্রতিপক্ষের প্রশংসা করেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক কুক। অন্যদিকে ড্র করে দারুণ উজ্জীবিত ক্লার্ক স্বপ্ন দেখেন সিরিজ সমতায় শেষ করার!

৭ উইকেটে ৫২৭ রানে প্রথম ইনিংস ও ৭ উইকেটে ১৭২ রানে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে সম্ভাবনায় এগিয়ে থাকা মাইকেল ক্লার্কের অস্ট্রেলিয়া। অলআউট হওয়ার আগে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ইলিশরা করে ৩৬৮ রান। চতুর্থ দিনের পর শেষ বিকেলের পর পঞ্চম দিনেও বৃষ্টির জন্য দেরিতে শুরু হয় খেলা। অধিনায়ক কুককে ০ রানে সাজঘরে ফেরান হ্যারিস। দলীয় ১৫ রানে ১১ রান করা জোনাথন ট্রটকে তুলে নিয়ে আরেকবার ধাক্কা দেন তিনি। ব্যক্তিগত মাত্র ৮ রান করে সিডলের বলে উইকেটের পেছনে ব্র্যাড হ্যাডিনের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নমুখি হন আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান কেভিন পিটারসেনও। এরপরই বৃষ্টির জন্য খেলা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। স্বস্তির ড্র পায় সিরিজে এগিয়ে থাকা ইংল্যান্ড। আর কুকদের নাগালের মধ্যে পেয়েও জয়বঞ্চিত অসিরা মাঠ ছাড়ে হতাশা নিয়ে।

 

দ্বিতীয় টেস্ট, লর্ডস, ১৮-২১ জুলাই

জো রুটের নৈপূণ্যে বিশাল জয় ইংল্যান্ডের

অ্যালিস্টার কুক, কেভিন পিটারসেন, জেমস এ্যান্ডারসন, ইয়ান বেল, জোনাথন ট্রট, গ্রায়েম সোয়ান, স্টুয়ার্ট ব্রডÑসম্ভবত বর্তমান টেস্ট অঙ্গনে ইংল্যান্ডই একমাত্র দল যাদের এক থেকে এগার নম্বর পর্যন্ত সবাই আন্তর্জাতিক মানের তারকা খ্যাতিসম্পন্ন ক্রিকেটার। অথচ লর্ডসের নায়ক এমন একজন যিনি এই দলের মধ্যে পড়েন না, তিনি জো রুট। ব্যাট হাতে প্রায় ডাবল সেঞ্চুরির (১৮০) ইনিংসের পর বল হাতেও গুরুত্বপূর্ণ দুই শিকারে লর্ডস মাতান ২২ বছরের নবীন প্রতিভা। ৩৪৭ রানের বিশাল জয়ে ঐতিহ্যের এ্যাশেজে তার দলও এগিয়ে যায় ২-০ ব্যবধানে। আর সব ছাপিয়ে তাই রুটের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন স্বাগতিক সেনাপতি অ্যালিস্টার কুক। তরুণ রুটকে ‘রাইট স্টাফ বা উপযোগী সদস্য’ বলে অভিহিত করেন তিনি।

প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের ৩৬১ রানের জবাব দিতে নেমে অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে যায় মাত্র ১২৮ রানে। দ্বিতীয ইনিংসে ৭ উইকেটে ৩৪৯ রানে ইনিংস ঘোষণা করে ইংলিশরা যে প্রতিপক্ষকে ৫৮৩ রানের পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় সেখানে রুটের অবদান ১৮০ রান।  এরপর হারার আগেই হেরে যাওয়া ম্যাচে অসিরা খানিক লড়াই দেখছিল মাইকেল ক্লার্ক (৫১) ও উসমান খাজার (৫৪) ব্যাটে। অকেশনাল স্পিন ভেল্কিতে অস্ট্রেলিয়া ইনিংসের সর্বোচ্চ রানের মালিককেই বধ করে সেও আশাও শেষ করে দেন ওই রুটই! ২৩৫ রানে গুটিয়ে যাওয়া ক্লার্কের দল হারে ৩৪৭ রানের বিশাল ব্যবধানে। সুতরাং অধিনায়কের প্রশংসায় তো তিনি ভাসবেনই, ‘আমার তো মনে হয় না ছেলেটি মাত্রই ক্যারিয়ারের অষ্টম টেস্ট খেলতে নেমেছে। ধৈর্য, শট নির্বাচন, ক্লাস সব মিলিয়ে একজন অভিজ্ঞ ওপেনারের মত খেলেছে ও। লর্ডসে রুটের নৈপূন্যে আমরা টিমমেটরাও গর্বিত।’ গর্বিত রুট নিজেও। কারণ লর্ডসে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরি হাকিয়ে সম্মানীয় ‘অনার্স বোর্ডে’ নাম লেখানোর পাশাপাশি নিজের নামটি রেকডের্ও অন্তর্ভুূক্ত করিয়েছেন তিনি। তৃতীয় দিন যখন সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন রুটের বয়স তখন মাত্র ২২ বছর ২০২ দিন। আগের রেকর্ডটি ছিল দূলিপসিংজিরÑ ১৯৩০ সালে ২৫ বছর বয়সে লর্ডসে সেঞ্চুরি করেছিলেন এই ইংলিশ ব্যাটসম্যান।

লর্ডসে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি হাকিয়ে ম্যাচের নায়ক বনে যাওয়া রোমাঞ্চিত রুট বলেন,‘সত্যি অসাধারণ অনুভূতি। লর্ডসে সেঞ্চুরি করা একজন ব্যাটসম্যানের আজীবনের স্বপ্ন। এত দ্রুত, তাও আবার অ্যাশেজের মতো ঐতিহাসিক মঞ্চে সেটি করতে পেরে খুবই ভাল লাগছে। এজন্য টিমমেট ও সার্পোট স্টাফদের ধন্যবাদ জানাই। তারাই আমাকে শিখিয়েছেন কিভাবে কঠোর পরিশ্রম করে মাঠে নামতে হয়। ড্রেসিং রুমে প্রত্যেকের আদর, সান্নিধ্য উপভোগ করছি আমি।’

 

 প্রথম টেস্ট, ট্রেন্টব্রিজ, ১০-১৪ জুলাই

রুদ্ধশ্বাস জয়ে শুরু ইংলিশদের

এবারের অ্যাশেজের আগমনী বার্তায় ছিল এক তরফার পূর্বাভাস; স্বাগতিক ইংলিশদের ‘হট ফেভারিটের’ বিপরীতে যেখানে অসিদের দেখা হচ্ছিল ‘স্বীকৃত আন্ডারডগ’ হিসেবে। অথচ ট্রেন্ট্রব্রিজের উদ্বোধনী লড়াইয়েই মঞ্চস্থ হয় ভিন্ন চিত্র। ইতিহাস-ঐতিজ্যের লড়াইটা জমে উঠেছিল দারুণভাবে। নানান ঘটন-অঘটনের পর যার সমাপ্তিটা হয় রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তায়। পরতে পরতে উত্তেজনার পারদ ঢেলে পঞ্চম দিনের শেষ বিকেলে ইংল্যান্ড জয় পায় মাত্র ১৪ রানে। দুই ইনিংসে (৫+৫) ১০ উইকেট নিয়ে ইংলিশদের জয়ের নায়ক পেস তারকা জেমস এ্যান্ডারসন। জয়ের জন্য দ্বিতীয় ইনিংসে অসিদের প্রয়োজন ছিল ৩১১ রান। ব্র্যাড হ্যাডিন-জেমস প্যাটিনসনের দাতে দাত চাঁপানো ব্যাটিং সত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি। অতিথিদের ২৯৬ রানে অলআউট করে রোমাঞ্চকর জয়ে মর্যাদার অ্যাশেজে ১-০ ব্যাবধানে এগিয়ে যায় অ্যালিস্টার কুকের ইংল্যান্ড। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া করেছিল ২৮০ রান। আর দুই ইনিংসে স্বাগতিক শিবিরের সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ২১৫ ও ৩৭৫ রান।

প্রতিপক্ষ যেখানে দূর্বার ইংল্যান্ড, সেখানে ট্রেন্টব্রিজের কন্ডিশনে চতুর্থ ইনিংসে তিন শতাধিক রান করে জয়টা মোটেই সহজ ছিল না। জবাব দিতে নেমে ১৬৪ রানেই যেখানে শীর্ষ ৬ ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া, খোদ অসি ভক্তরাও হয়ত তখন আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল প্রত্যাশিত সহজ জয়ের পথেই এগোচ্ছে ইংলিশরা। কিন্তু সপ্তম ও দশম উইকেট জুটিতে অন্য কিছুর আভাস দিতে শুরু করেন এ্যাস্টন এ্যাগার-ব্র্যাড হ্যাডিন ও ব্যাড হ্যাডিন-জেমস প্যাটিনসন জুটি। ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন টান টান উত্তেজনা। আলোচিত এ্যাগারকে নিয়ে সপ্তম উইকেটে ৪৩ রান যোগ করেন ‘ট্র্যাজিক হিরো হ্যাডিন।’ প্রথম ইনিংসে এগার নম্বরে নেমে রেকর্ড ৯৮ রান করে হৈচৈ ফেলে দেয়া এ্যাগার আউট হন ১৪ রান করে। তঁকে ফিরিয়ে দিয়ে দলকেও সাময়িক স্বস্তি এনে দেন ম্যাচের সফল বোলার এ্যান্ডারসন। এ্যাগার যখন আউট হন অস্ট্রেলিয়ার রান তখন ৭ উইকেটে ২০৭। জয়ের পথ শতাধিক রানের দুরত্বে। ২১১ রানে মিচেল স্টার্ক ও নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে পিটার সিডল যখন আউট হন স্বপ্নভঙ্গের অপেক্ষায় থাকা অতিথিদের রান তখন ২৩১।

আরেকবার ম্যাচ হেলে পরে ইংল্যান্ডের দিকে। অস্ট্রেলিয়াকে জেতাতে হলে শেষ উইকেট জুটিতে জেমস প্যাটিসনকে নিয়ে হ্যাডিনকে করতে হবে আরও ৮০ রান। ওভার বা সময় যাই থাক, জেমস এ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, স্টিভেন ফিন আর গ্রায়েম সোয়ানের মতো বিশ্বসেরা গোলকবাজদের বিরুদ্ধে যা প্রায় অসম্ভব। সেই অসম্ভবটা শেষ পর্যন্ত অসম্ভবই রয়ে যায়। কিন্তু ব্যাট হাতে ম্যাচ ঘোরতর নাটকীয়তার দিকে টেনে নিয়ে গেছেন হ্যাডিন-প্যাটিনসন। শেষ উইকেটে ৬৫ রান করে জমিয়ে তোলেন দু’জনে। এ পর্যায়ে কুকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেন তাঁরা। লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়ার আগে ২৩১/৯ থেকে ২৯১/৯Ñ অর্থাৎ বোর্ডে আরও ৬০ রান যোগ করে কাঁপিয়ে দেন প্রতিপক্ষকে। যেই ব্রডে ভর করে অম্ভব এক স্বপ্নের হাতছানি দেখছিল অসিরা, দিনভর দারুণ ধৈর্য আর ক্ল্যাসের প্রতিমুর্ত হয়ে খেলছিলেন, লাঞ্চের পর সেই হ্যাডিন কেন যে ওভাবে আক্রমনাত্বক হতে গেলেন! দলীয় সংগ্রহে আর ৫ রান যোগ করে এ্যান্ডারসনের বল তুলে দিলেন উইকেটের পেছনে ম্যাট প্রিয়রের হাতে। ১৪ রানের দূরত্বে থেমে যায় রুদ্ধশ্বাস অভিযান। ৭১ রানের অসাধারন ইনিংস খেলেও ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হয়ে থাকেন হ্যাডিন। প্যাটিনসন অপরাজিত থাকেন ২৫ রানে। প্রথম ইনিংসে ৬৯ রানে ৫টির পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ৭৩ রান দিয়ে ৫টি উইকেট ( মোট ১০) নিয়ে ম্যাচের সেরা স্বাগতিক পেসার জেমস এ্যান্ডারসন। ইংল্যান্ডের কম ব্যবধানে জয়ের হিসেবে ট্রেন্ট ব্রিজের ম্যাচটি থাকছে ষষ্ঠ স্থানে। এর আগে বার্মিহামে ২০০৫ সালে সবচেয়ে কম ২ রানে জয়ের রেকর্ড রয়েছে ইংলিশদের!

 

শেষ পাঁচটি অ্যাশেজ সিরিজের ফল

 

মৌসুম      টেস্ট      স্বাগতিক     জয়ী দেশ   ব্যবধান

 

২০০৫      ৫টি        ইংল্যান্ড          ইংল্যান্ড          ২-১

 

২০০৬-০৭   ৫টি        অস্ট্রেলিয়া    অস্ট্রেলিয়া    ৫-০

 

২০০৯      ৫টি        ইংল্যান্ড          ইংল্যান্ড          ২-১

 

২০১০-১১   ৫টি        অস্ট্রেলিয়া    ইংল্যান্ড          ৩-১

 

২০১৩           ৫টি        ইংল্যান্ড          ইংল্যান্ড          ৩-০ (অসমাপ্ত)।

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।