কার কারণে ডুবলো হকি?

Filed under: ফিচার,সময়ের খেলা |

hockey-4 

‘আশা বসে আছে কাঁঠের খাঁচায়/এই আশাই আজও মোরে বাঁচায়/জীবনের জলসাঘরে কেবলই নাচায়/কখনও ঘৃণা কখনও ভালবাসায়’। আশায় পড়লো গুড়েবালি। পঞ্চম বা ষষ্ঠ কোনটাই হতে পারলো না বাংলাদেশ জাতীয় হকি দল। চরম ভরাডুবি আর একরাশ হতাশা নিয়ে দেশে ফিরেছে তারা। ২৪ আগস্ট থেকে মালয়েশিয়ার ইপোতে অনুষ্ঠিত হয় ‘এশিয়া কাপ হকি’র নবম আসর। এর আগে এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্থান ছিল ষষ্ঠ। এবার গ্রুপ পর্ব পার হয়ে আসরে আট জাতির লড়াইয়ে পঞ্চম হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে  ঢাকা ছেড়েছিল জিমি-চয়ন-জাহিদরা। টুর্নামেন্টে এবার ষষ্ঠ হলে আগামী বছর এশিয়া কাপে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পেত বাংলাদেশ। তাই এ লক্ষ্য নিয়েই দেশ ছেড়েছিল দলটি। কিন্তু ধুলায় মিশে গেছে সেই আশা।

এই প্রতিযোগিতার ‘বি’ গ্রুপে প্রতিটি খেলায় বাংলাদেশ শোচনীয়ভাবে হেরেছে যথাক্রমে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৯-০, ওমানের কাছে ৪-২ এবং ভারতের কাছে ৯-১ গোলে। এরপর স্থান নির্ধারণী খেলায় জাপানের কাছে ৩-০ গোলে হারার পর ষষ্ঠ হওয়ার আশা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। সবশেষে টানা চার ম্যাচ হারার পর শনিবার সপ্তম স্থান নির্ধারণী খেলায় চাইনিজ তাইপেকে ১১-৩ গোলে বিধ্বস্ত করে স্বান্তনার জয় কুড়িয়ে নেয় জিমি-চয়নরা। এশিয়া কাপের ইতিহাসে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়।

অথচ দেশ ছাড়ার আগে প্রতিশ্রতির নহর বইয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ দল। দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় রাসেল মাহমুদ জিমি বলেছিলেন, ‘আমাদের দলের লক্ষ্য ষষ্ঠ স্থান হলেও আমার ধারণা পঞ্চমও হতে পারি আমরা। আমাদের সেই শক্তি এবং সামর্থ্য আছে। তাছাড়া পাকিস্তানী কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের প্রস্তুতিটাও ভাল হয়েছে। তবে শুধু ঘাটতি রয়েছে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার। কোন বিদেশী দলের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলা সম্ভব হলে আরও ভাল হতো।’

জাতীয় দলের অধিনায়ক চয়ন বলেছিলেন, ‘প্রস্তুতি ম্যাচের ঘাটতি থাকলেও এশিয়া কাপের জন্য আমরা শতভাগ প্রস্তত। ভারত, ওমান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কীভাবে খেলতে হবে, সে বিষয়ে কোচ আমাদের আলাদা আলাদা প্ল্যান দিয়েছেন। আশা করি সেই প্ল্যান মোতাবেক আমরা মাঠে খেলতে পারব।’

দলের পাকিস্তানী কোচ নাভিদ আলম বলেছিলেন, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারলে টুর্নামেন্টে চমক দেখাবে বাংলাদেশ। আমাদের প্রথম টার্গেট এশিয়া কাপের মূলপর্বে কোয়ালিফাই করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারলে বাংলাদেশ সবাইকে বিস্মিতও করতে পারে। ঠিকমত সব হলে আমরা ড্র, জয় সবই আনতে পারি। আমি ৪৫ দিনের কোচিংয়ে ট্যাকটিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছি। কিভাবে প্রতিপক্ষকে ঠেকাবো সেটা নিয়ে কাজ করেছি।’

ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খাজা রহমতউল্লাহ্ বলেছিলেন, ‘টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের লক্ষ্য অন্তত ষষ্ঠ স্থানে থাকা। এর মাধ্যমে আগামী বছরে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া কাপের বাছাইপর্ব খেলতে হবে না বাংলাদেশকে। সরাসরি চূড়ান্তপর্বে খেলতে পারবে। এশিয়ান গেমসের চূড়ান্তপর্ব নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।’

শেষ পর্যন্ত কি হয়েছে, সেটা সবারই জানা।

কোরিয়ার কাছে হারটা ছিল প্রত্যাশিতই। শক্তির দিক থেকে অনেক এগিয়ে তারা। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের কাছে বড় হারের (৯-০) পর ঘুরে দাড়াবে জিমি-চয়নরা এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। হিসেব উল্টে দিয়ে ওমানের কাছেও ভরাডুবি হলো জাতীয় হকি দলের। হেরেছে ৪-২ গোলে। যা কখনো প্রত্যাশার নয়। পর পর দুই ম্যাচ হারে পঞ্চম তো দূরের কথা ষষ্ঠ হওয়ার আশাও শেষ হয়ে যায় লাল-সবুজ জার্সিধারীদের।

গত বছর ২৪ এপ্রিল ব্যাঙ্ককে এএইচএফ কাপের ফাইনালে ওমানকে ৬-৩ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দুই দল এবার সুযোগ পেয়েছিল এশিয়া কাপ খেলার। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লীতে ওয়ার্ল্ড হকি লীগের দ্বিতীয় রাউন্ডে ৪-১ গোলের জয় রয়েছে।  মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি যেন আগের হারের প্রতিশোধ নিলো কড়ায় গ-ায়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বপ্নের ভেঙ্গে দেয়। অথচ ওমানের বিরুদ্ধে এর আগে ৯ বার দেখায় আট বারই জিতেছে বাংলাদেশ। একবার হেরেছে ৬-৫ এ, গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে।

ওমানের কাছে হারটা মানতে পারছে না সংগঠকরা। কারণ, সর্বশেষ দুইবার মুখোমুখিতে জিতেছে বাংলাদেশ। এএইচএফ কাপের ফাইনালে ৬-৩ ও ওয়ার্ল্ড হকি লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডে ৪-১ গোলে জিতেছিল চয়নরা। সাবেক হকি তারকা প্রতাপ শঙ্কর হাজরার জানান, ‘একটা ধারাবাহিক সাফল্য পাওয়া দলের সমন্বয়টা এশিয়া কাপে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। স্থানীয় কোচ মাহবুব হারুনের অধীনে জাতীয় দল গত কয়েক বছর ধরে বেশ ভালো করছিল। এএইচএফ কাপ ও ওয়ার্ল্ড হকি লিগের দুই রাউন্ডে অসাধারণ খেলেছে। কিন্তুহারুনকে সরিয়ে নাভিদ আলমকে আনায় আরো ক্ষতি হয়েছে। এশিয়া কাপের মতো টুর্নামেন্টে এমনটা ঠিক হয়নি।’ আড়াই মাসেও যে নাভিদের কৌশল রপ্ত করতে পারেননি খেলোয়াড়রা তা ‘কৌশলে’ মানলেন আরেক সাবেক তারকা রফিকুল ইসলাম কামাল, ‘কোরিয়ার কাছে ৩-৪ গোলের হার মানা যেত, ৯ গোল বেশি হয়ে গেছে। ওমানের বিপক্ষে আমাদের মাঝমাঠ ছিল না। সমন্বয়ের অভাব দেখা গেছে।’ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খাজা রহমতুল্লাহও মানতে পারছেন না এমন হার, ‘এতো লম্বা সময় প্র্যাকটিসের পর এমন ফল মানা যায় না। আমার কাছে মনে হয়েছে খেলোয়াড়রা মাঠে কোচের নির্দেশনা মানেনি। তাছাড়া ক্যাম্প চলাকালে উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে। তবে ম্যানেজার ও কোচের রিপোর্ট পেলে বোঝা যাবে ঘটনা কি।’

মালয়েশিয়ার ইপোতে দুর্ভাগ্য ভর করেছে বাংলাদেশের ওপর। তবে তা খেলোয়াড়দের জন্য নয়, হকি ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের জন্য। নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করণ ও আখের গোছানোতে ব্যস্ত কর্মকর্তারা কামড়াকামড়িতেই ব্যস্ত। ফেডারেশনের নির্বাচন নিয়ে হয়েছে রীতিমত এক নাটক। এসবের মধ্যে জাতীয় দল নিয়ে তাদের ভাবার সময় কই! যার খেসারত দিল জাতীয় দল। ম্লান হলো দেশের মর্যাদা। যে ওমানকে ঘোষণা দিয়ে হারাতো তাদের কাছেই কিনা লজ্জাজনক হার। যে দলবদল খেলোয়াড়দের আয়ের একমাত্র পথ। তা না হওয়ার দুশ্চিন্তা নিয়ে ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে তাদের। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া খেলোয়াড়রা ক্যাম্প বর্জনের ঘোষণা দেয়ার ফল হিসেবে নানা রকম হুমকি এসেছে দলবদল নিশ্চিত করতে না পারা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। বিকেএসপির খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গড়ে এশিয়া কাপে পাঠানোর গুঞ্জনও শোনা গিয়েছি। শেষ পর্যন্ত ৫ সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়কে বিভিন্ন মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা শাস্তিও পেতে হয়েছে। এতসব মানসিক চাপের মধ্যে অনুশীলন করেছেন দেশসেরা খেলোয়াড়রা। আর আড়াই মাস অনুশীলন হলেও একটিও প্রীতি বা অনুশীলন ম্যাচের আয়োজন করতে পারেননি অথর্ব কর্মকর্তারা। কোচও যেন সায় দিয়েছেন এসব কর্মকা-ে। কর্মকর্তাদের ইচ্ছায় মধ্যমাঠের দুই কৃতি খেলোয়াড় শেখ নান্নু, সারোয়ারকে বাদ নিয়ে চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেন তিনি। এ দুইজনের শূণ্যতা ম্যাচে প্রকটভাবে অনুভূত হয়েছে। এমনকি কোন বিদেশি দলের সঙ্গে দেশের মাটিতে একটি  প্রীতিম্যাচও আদায় করতে পারেননি তিনি। বরং প্রীতিম্যাচ না হলেও দল ভাল করবে বলে নিয়মবিরুদ্ধ বক্তব্যও দিয়েছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি চমক দেখানোর কথাও বলেছিলেন। এদিনের হালে আসেলই চমকে গেল পুরো দেশ! হকি ফেডারেশনের কর্মকা-ের নেতিবাচক প্রভাবেই এ দূরবস্থা জেগে ওঠা দেশের হকির। হয়তো সামনে দলবদল ও লীগে আরো অনেককিছুই ঘটার বাকি আছে।

rumelboss@gmail.com

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।