আমিনুলের ১১টি বিশ্লেষণ

Filed under: সময়ের খেলা |

SAFF-Champio

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন রুমেল খান

‘যেই লাউ, সেই কদু’ এবং ‘যত গর্জে, তত বর্ষে না’, প্রবাদ দুটি এখন যেন শতভাগ প্রযোজ্য বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ক্ষেত্রে। অনেক আশা নিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে চার-চার জন ডাচ্ কোচ নিয়ে হিমায়ের দেশ নেপালের কাঠমন্ডু গিয়েছিল বাংলাদেশ দল। লক্ষ্য ছিল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে দীর্ঘ দশ বছরের আক্ষেপ আর বন্ধ্যাত্ম ঘোঁচানো। কিন্তু বাস্তব যে বড়ই রূঢ় এবং নিমর্ম।

স্বপ্নপূরণের ধারে-কাছেও যেতে পারেনি লোডভিক ডি ক্রুইফের শিষ্যরা। আশার সলিল সমাধি ঘটেছে গ্রুপ পর্বেই, পাকিস্তানের কাছে ২-১ গোলে হেরে (এর আগে নেপালের কাছে ২-০ গোলে হারের পর ভারতের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র)। তিন ম্যাচে সর্বসাকুল্যে সংগ্রহ মাত্র ‘সবেধন নীলমণি’ একটি পয়েন্ট!

এ যেন ঠিক গত সাফেরই পুনরাবৃত্তি! ২০১১ দিল্লী সাফে পাকিস্তানের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে এক পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ। এবারও তাই। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন খুব আশা করেছিলেন অন্ততঃ এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলবে বাংলাদেশ। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি।

যে দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আশা নিয়ে গিয়েছিল হিমালয়ের দেশে, তাদের কোন রিক্ত হস্তে ফিরে আসতে হলো? কেন এমন হল? এর উত্তর খুঁজছেন এমনই একজন, অনেকের মতেই যিনি একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক ছিলেন। এছাড়া দেশীয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক এবং সর্বশেষ তারকা ফুটবলার হচ্ছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেয়ার পর (ম্যাচ-৫৫, সময়কাল: ১৯৯৮-২০১০) তিনি এখনও কৃতিত্বের সঙ্গে খেলে যাচ্ছেন ঘরোয়া ফুটবলে। তিনি আমিনুল হক। সময়ের কথার পাঠক, চলুন, শোনা যাক সাফ ফুটবলে ব্যর্থতা সম্পর্কে তার ১১টি বিশ্লেশণ-

IMG_3465[1]

১,

দল নয়, ফোকাস ছিল চার কোচের ওপর ॥ ডাচ্ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ এবং তাঁর সহকারী রেনে কোস্টার আসার পর থেকেই তাঁদের নিয়েই মাতামাতি হয়েছে বেশি। সেটা আরও বেড়ে যায় যখন আরও দুই ডাচ্ সাপোর্টিং স্টাফ (ফিজিও এবং বিশেষজ্ঞ গোলরক্ষক কোচ) দলের সঙ্গে যোগ দেন। এতে করে জাতীয় দলের ফুটবলারদের ওপর থেকে ফোকাসটা সরে যায়। সবাই ভেবেছিল, কোচ হয়তো জাদুকর। রাতারাতি সাফল্য এনে দেবেন। এটা যে ভুল ধারণা ছিল, সেটা তো এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। মাত্র দুই মাসের অনুশীলনে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। অন্য দেশগুলি আরও বেশি সময় ধরে অনুশীলন করেছে।

২.

কাজে দেয়নি ফর্মেশন ॥ কোচ যে ফর্মেশনে দলকে খেলাতে চেয়েছেন, তা কাজে দেয়নি। প্রতিপক্ষ কোচের রণকৌশলের কাছে মার খেয়ে গেছেন তিনি।

৩.

প্রতিকূল দর্শকদের বিরুদ্ধে খেলার অনভ্যাস ॥ কোচ ক্রুইফ যেসব ফুটবলারদের নিয়ে নেপালে গিয়েছিলেন, তাদের-৩ জন বাদে বাকিরা সবাই ছিল তরুণ। বেশিরভাগেরই আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, ভিন্ন দেশের মাটিতে দর্শক সমর্থনের বিপরীতে খেলার অভ্যাস নেই। এবার সেটাই হয়েছে। প্লেয়াররা তাদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারেনি। তারা নার্ভাস ছিল। বিশেষ করে নেপালের সঙ্গে ম্যাচে।

 

৪.

নেতিবাচক দিক মামুনুলের ইনজুরি ॥ দলের সেরা খেলোয়াড় ছিল অধিনায়ক ও মিডফিল্ডার মামুনুল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইনজুরির জন্য প্রথম ম্যাচে খেলেনি। দ্বিতীয় ম্যাচে কিছুক্ষণের জন্য ইনজেকশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। কিন্তু তাকে দলের আরও বেশি দরকার ছিল। তার চোট দলকে ভুগিয়েছে। এটা ছিল নেতিবাচক দিক।

৫.

ভাষাগত সমস্যা ॥ নেপাল থেকে দেশে ফেরার পর কয়েকজন ফুটবলারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা আমাকে বলেছে তারা কোচের ভাষা তারা ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। এমনও হয়েছে না বুঝেও কোচকে বলেছে বুঝতে পেরেছি। এই ভাষাগত সমস্যার কারণে কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের যোগাযোগটা ঠিকমতো হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। প্ল্যান মোতাবেক খেলতে পারেনি দল।

৬.

কমিটমেন্ট ও মোটিভিশনের অভাব ॥ আমার কাছে মনে হয়েছে দলের প্লেয়ারদের ভেতর তিনটি জিনিষের অভাব বা ঘাটতি ছিল। কমিটমেন্ট, মোটিভিশন আর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গুরত্ব অনুধাবন করার মানসিকতা।

৭.

ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা ॥ একটা দলকে সাফল্য এনে দেয়ার জন্য সবার আগে প্রয়োজন দক্ষ টিম ম্যানেজমেন্ট। সেটা ছিল না এবার। তাই প্রত্যাশিত রেজাল্টও আসেনি।

৮.

মামুন খানের সমস্যা ॥ গোলরক্ষক হিসেবে মামুন খানের যোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। দেশের এক নম্বর গোলকিপার তিনি। বিপ্লব ভট্টাচার্য্যের মতো সিনিয়র গোলরক্ষককে বসিয়ে রেখে কোচ তাকে খেলিয়েছেন। তবে তাঁর প্রতি আমার পরামর্শ হলোÑ ঘরোয়া ফুটবল আর আন্তর্জাতিক ফুটবল এক নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলতে হলে অবশ্যই তাঁকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’ কিছু করতে হবে। আরও বেশি করে খেলতে হবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ। নইলে টিকে থাকা যাবে না।

৯.

সমস্যা সব পজিশনেই ॥ ডিফেন্স, মিডফিল্ড, ফরোয়ার্ডÑ সব পজিশনেই সমস্যা ছিল। প্রতিপক্ষ প্লেয়ারদের মার্কিং করে খেলতে পারিনি আমরা। মিডফিল্ড হচ্ছে খেলার প্রাণ। মামুনুল আহত থাকায় সেই মিডফিল্ডই ছিল অকেজো। ঘরোয়া লীগে আমরা দেখছি বিদেশী ফরোয়ার্ডদের দাপট। দেশীয়রা তেমন সুযোগ পায় না। বসে থাকে সাইড বেঞ্চে। ম্যাচ খেলার ঘাটতি থেকে যায়। জাতীয় দলে খেলতে গেলে স্কোরিংয়ে তাই সমস্যা হয়।

১০.

সময় দিতে হবে কোচকে ॥ সাফল্য পেতে ক্রুইফকে আরও সময় দিতে হবে। হুট করে এনে আবার হুট করে তাঁকে বিদায় করে দেয়াটা সমীচীন হবে।

১১.

ফুটবল গোলের খেলা। সেটাই করতে পারছি না আমরা। আমার পরামর্শ হচ্ছে, ঘরোয়া লীগে বিদেশী প্লেয়ার খেলানো বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে স্ট্রাইকার পজিশনে। এতে উপকৃত হবে জাতীয় দল।

rumelboss@gmail.com

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।