|

বিশ্ব রিদমিক জিমন্যাস্টিকসে আমাদের অহঙ্কার

zimnast-1

মারগারিতা। যার ধমনীতে বইছে বাঙ্গালী রক্ত। ফলে আজ স্বীয় সাফল্যে আলোকিত মেয়েটি একই সাথে উজ্জ্বল করেছেন বাঙ্গালী জাতির মর্যাদাকেও। যার পুরো নাম মারগারিতা মামুন। মূলত; তিনি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই সপ্তদশবর্ষী রাশিয়ান রিদমিক জিমন্যাস্ট। বর্তমানে ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে এক নম্বর। ২০১৩ ওয়ার্ল্ডকাপ ও ২০১১-১৩ টানা তিন মওসুম রাশিয়ান ন্যাশনাল অল-অ্যারাউন্ড চ্যাম্পিয়ন। ইন্টারন্যাশনাল এলিট লেভেলের জিমন্যাস্ট রিতা কাজানের গ্রীষ্মকালীন ইউনিভার্সিয়াডেও অল-অ্যারাউন্ড চ্যাম্পিয়ন।

বাঙ্গালী বা প্রবাসে জন্ম নেয়া যে কোনো বাঙ্গালী সন্তানের সাফল্যে আমরা যারা প্রবাসে বসবাস করে থাকি তাদের মাথেটা স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হয়ে যায়।

জানা যায়, সোভিয়েত শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে ১৯৮৩ সালে রিতার বাবা রাজশাহীর সন্তান মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, আবদুল্লাহ আল মামুন রাশিয়ায় চরে যান। সেখানে বিয়ে করেন রুশ নারী আন্নাকে। ১৯৯৫ সালের ১লা নভেম্বর মস্কোতে তাদের ঘরে জন্ম নেন রিতা। বাবা-মা’র দুই সন্তানের মধ্যে তিনিই বড়।

রিতার বয়স যখন সাত বছর তখন তিনি শুরু করেন রিদমিক জিমন্যাস্টিকস চর্চা। স্কুলে ভর্তির পর ডালপালা মেলতে থাকে তার জিমন্যাস্ট হওয়ার স্বপ্ন। জিমন্যাস্টিকসে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা নিয়ে ১১ বছর বয়স থেকেই শুরু করেন কঠোর অনুশীলন। তিনি সাবেক ওয়ার্ল্ড রিদমিক চ্যাম্পিয়ন আমিনা জারিপোভার কাছে প্রশিক্ষণ নেন। জুনিয়র জিমন্যাস্ট হিসেবে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন রিতা। ২০০৫ সালে এস্তোনিয়ায় অনুষ্ঠিত মিস ভ্যালেন্টাইন কাপে কারোলিনা সিবাস্তিয়ানোভার সঙ্গে জুটি বেঁধেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের হয়েও রিদমিক জিমন্যাস্টিকস প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে রাশিয়ার হয়েই অংশ নেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

মূলত ২০১১ সালটাই রিতার সাফল্যের বছর। এ বছরে তার সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হয় রাশিয়ার চ্যাম্পিয়নশিপে হুপ ও বলে অল-অ্যারাউন্ড চ্যাম্পিয়নের পালক। তার এ সাফল্য খুলে দেয় রাশিয়ান জাতীয় দলের দুয়ার। ২০১১ সালেই প্রথম সিনিয়র হিসেবে অংশ নেন মন্ট্রিয়লে ওয়ার্ল্ড কাপে। ১০৬.৯২৫ পয়েন্ট অর্জন করে অল-অ্যারাউন্ড জিতে নেন ব্রোঞ্জ। আর বল ফাইনালে ২৭.০২৫ পয়েন্ট নিয়ে প্রথম স্থান অধিকারী রিতার মুকুটে যুক্ত হয় স্বর্ণ। এরপর ২০১২ সালে দারিয়া দিমিত্রিকোভার সাথে জুটি বেঁধে জাপানে এওন কাপে স্বর্ণ, কিয়েভে ওয়ার্ল্ড কাপে বল ও ক্লবসে স্বর্ণ, হুপ, বল আর রিবনে ব্রোঞ্জ পদক, মস্কো গ্রান্ড প্রিক্সে রিতা অল-অ্যারাউন্ডে নবম স্থান, তাসখন্দ ওয়ার্ল্ডকাপে অল-অ্যারাউন্ডে চতুর্থ স্থান পান।

২০১৩ সালে মস্কো গ্র্যান্ড প্রিক্সে স্বর্ণ জেতার মধ্য দিয়ে মওসুমের শুভসূচনা করেন। এরপর কাজানে ইউনিভার্সিয়াড, সেন্ট পিটার্সবার্গে ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড়ক্রীড়া ইভেন্টগুলোতে রিতা রিদমিক জিমন্যাস্টিকসে নিজের নৈপুণ্য ও দক্ষতার পরিচয় দেন। ২০১৩ ওয়ার্ল্ডকাপ চ্যাম্পিয়নশিপে বল ও ক্লাবসে স্বর্ণ এবং হুপে ব্রোঞ্জ, ভিয়েনায় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে টিম ও রিবনে স্বর্ণ, হুপ-বল ও ক্লাবসে রূপা, ২০১৩ সালে সেন্টপিটার্সবুর্গে ওয়ার্ল্ডকাপ ফাইনানে অল-অ্যারাউন্ড, হুপ, রিবন ও ক্লাবে স্বর্ণ এবং বলে রূপা অর্জন করেন। ২০১৩ কাজান গ্রীষ্মকালীন ইউনিভার্সিয়াডে অল-অ্যারাউন্ড, হুপ, ক্লাবস ও বলে স্বর্ণ জয় করেন। রিদমিক জিমন্যাষ্টে তার ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য মিউজিকগুলো হচ্ছে- ২০১৩ সালে হুপে মারিয়া বায়ো’র ‘ডোনা ফ্রান্সিসকুয়েটা’, বলে চুপিনের ‘নকটার্ন ইন সি শার্প মাইনর’, ক্লাবসে পিটার সিনকোট্টির ‘আই লাভ প্যারিস’, রিবনে আন্না জার্মানের ‘ইকো অপ লাভ’, ২০১২ সালে হুপে চার্লিজ আজনাভোয়ের ‘লা বোহেমি’, বলে সেকরেট গার্ডেনের ‘সং ফ্রম এ সেকরেট গার্ডেন’, ক্লাবসে বিল হুইলান ও মিগুয়েল চেকোভস্কির ‘আন্দালুসিয়া’, রিবনে জ্যাক ব্রেলের ‘নে মে কুইট্টো পাস’ ও রয়েল ওরচেষ্ট্রার ‘মানি মানি মানি’। বর্তমানে তার প্রশিক্ষক ইরিনা ভিনের এবং কোরিওগ্রাফার ইরিনা জেনোকভা।

রাশিয়ার নাগরিক হলেও রিতা নিজের বাঙ্গালী পরিচয়কে তুলে ধরেন অহঙ্কারের সাথে। যার অকপট স্বীকারোক্তি রাশিয়ার একটি গণমাধ্যমকে দিয়েছেন তিনি

রাশিয়ার নাগরিক হলেও রিতা নিজের বাঙ্গালী পরিচয়কে তুলে ধরেন অহঙ্কারের সাথে। যার অকপট স্বীকারোক্তি রাশিয়ার একটি গণমাধ্যমকে দিয়েছেন তিনি

এখানে একটি বিষয় বেশ লক্ষ্যনীয় যে, রাশিয়ার নাগরিক হলেও রিতা নিজের বাঙ্গালী পরিচয়কে তুলে ধরেন অহঙ্কারের সাথে। যার অকপট স্বীকারোক্তি রাশিয়ার একটি গণমাধ্যমকে দিয়েছেন তিনি। তিনি তার উত্তরাধিকারকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন। জানা যায়, ছোটবেলায় বাবার সাথে বেশ কয়েকবার বেড়াতে গিয়েছেন বাংলাদেশে। এক সময় ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলাও বলতে পারতেন।

রিদমিক জিমন্যাস্টিকসের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে গত তিন বছর ধরে টানা অল-অ্যারাউন্ড ইভেন্টে চ্যাম্পিয়নশিপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে ক্রীড়ামোদীদের নজরে চলে এসেছেন এ তরুণী। রিতার ধারাবাহিক ও গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যের কারণে রিতাকে নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেছে রাশিয়ায়। দেশটির গণমাধ্যমে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘বাংলার বাঘিনী’ নামে। খোদ রাশিয়ার জাতীয় রিদমিক জিমন্যাস্টিকস দলের কোচ ইরিনা ভিন তাকে এ উপাধি দিয়েছেন। সম্প্রতি ইউরো স্পোর্ট নামের একটি রুশ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে উঠে এসেছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জিমন্যাস্ট রিতা।

মেয়ের ধারাবাহিক ক্রীড়ানৈপুণ্যে গর্বিত আবদুল্লাহ আল মামুন। কন্যার সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি একজন বাঙ্গালি। তাই মেয়ের যে কোন সাফল্যকে শুরুতে একজন বাঙালি হিসেবে অনুভব করি। রিদমিক জিমন্যাস্টিকসে আরও ভাল করার জন্য রিতা অনেক চেষ্টা করছে। আজকের দিন পর্যন্ত যে সাফল্য এসেছে তা শুধুমাত্র রিতার নিজের প্রচেষ্টার কারণে। আমাদের পরিবারের ভালবাসা, আগ্রহ আর মেয়ের ঐকান্তিক চেষ্টাও ছিল। আর সব মিলিয়ে এ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।’ অপরদিকে, রাশিয়ার বাংলাদেশ কমিউনিটিতে রিতার অর্জন নিয়ে অনেক বইছে প্রশংসা ও আনন্দের জোয়ার। মস্কোতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেককে রিতার প্রতিযোগিতার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের সাইটে প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

-শোয়েব শাহিন

 

 

 

 

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা