রাজনৈতিক দলের ভাঙা-গড়া : একটি পর্যালোচনা

Filed under: ফিচার,মতামত |

politicianবাংলাদেশ সেই দেশ যেই দেশে রাজনৈতিক দলের জন্ম-মৃত্যু, উত্থান-পতন আকস্মিকভাবে ঘটে এবং ক্ষমতার সমান্তরালে চলে। যে যখন ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে সেই তখন ইচ্ছে করলে একটি রাজনৈতিক দল জন্ম দিতে পারে। এমনকি সে ইচ্ছে করলে পূর্ববর্তী কোনো জনপ্রিয় দলকেও করতে পারে টুকরো টুকরো, ছিন্নভিন্ন, অতীতে আমরা এরকম ইতিহাস বহুবার দেখেছি, এখনও সেই ভাঙাগড়ার দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে মঞ্চায়িত হচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠিত দল ভেঙে যখন শাখা দল তৈরি হয়, তখন মূল দল কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বটে, তবে এই নবসৃষ্ট শাখা দল সাময়িক ভাবে কিছুটা লাভবান হলেও পরিণামে ধ্বংসের মুখেই নিপতিত হয়। এ ক্ষেত্রে ড. কামাল ও ডা. বদরুদ্দোজার উদাহরণই যথেষ্ট। কেউ কেউ কোনো রকম টিকে থেকে অন্য ক্ষমতাবান পার্টির লেজুরবৃত্তি করে মাত্র। বাংলাদেশে এখন যেসব দল লেজুরবৃত্তি করছে তারা মূলত মূল দল থেকে ভেঙে আসাই। এদের একক সত্তা ততবেশি ক্ষমতাবান নয়, তবে এরা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। গণতন্ত্রে জনতার সমর্থন অর্থাৎ ভোটের সংখ্যাই বড়। যেমন মহাত্মা গান্ধীরও এক ভোট আর তার ছাগল রক্ষকেরও এক ভোট। তার মানে গণতন্ত্রে গুণগত মান নয়, সংখ্যাই প্রধান।

আজকের বাংলাদেশে শাখা দলও আরো নানা শাখায় বিভক্ত হচ্ছে। এত টুকরো টুকরো দল বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিকে কিছু সময়ের জন্য হলেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশে যেই দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সেই দলেরই কিছু কিছু ছোট ছোট দলের সাহায্য-সমর্থন লাগে, এখন এই ছোট ছোট দলগুলো যখন আরো ছোট হচ্ছে, তখন রাজনীতিতে ‘প্রেসার গ্রুপ’ থাকছে না। ফলে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলগুলো স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ ভাবছে এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই দল যাদের সঙ্গে এই ছোট ছোট দলগুলো জোটভুক্ত। ছোট দলগুলির কোনো মেরুদণ্ড নেই, আদর্শও নেই, হালুয়া-রুটির জন্য যে কোন দলের সঙ্গে তারা জোট বাঁধে।

imagesবাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের পর থেকেই রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। এর কারণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্মম মৃত্যু। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে আওয়ামী লীগকে ভেঙেচুরে তছনছ করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। মূলত তথাকথিত বামপন্থীদের দিয়েই আওয়ামী শিবিরে এই ভাঙন লাগানোর চেষ্টা করা হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে আসেন, আর ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদের আহ্বায়ক কমিটি ও ২৩ ডিসেম্বর জাসদের জাতীয় সম্মেলনে মেজর জলিল সভাপতি, আ.স.ম. আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। এর পূর্বেই ছাত্রলীগ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগকে ভাঙার যিনি মূল নায়ক ও পরিকল্পনাকারী তার নাম জেনারেল জিয়াউর রহমান। জেনারেল জিয়া আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত ও বিভাজিত করার জন্য এমন কোন ষড়যন্ত্র নেই যে না করেছিলেন।

এরশাদের আমলে তো আওয়ামী লীগকে নানা কায়দায় ক্ষমতার বাইরে রাখার পায়তারা দেখা যায়। এরশাদও চেষ্টা করেছিলেন আওয়ামী লীগের মধ্যে ভাঙন ধরার, তবে এরশাদের সেই দূরভিসন্ধি সফল হয়নি। এরশাদের পরে ক্ষমতায় আসেন জিয়াপত্নী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ও তার পুত্র তো আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকেই চিরতরেই শেষ করে দেয়ার গোপন ষড়যন্ত্রেই বেশির ভাগ সময় লিপ্ত থাকেন। শুধু কি তাই? তাদের কর্মফলের কারণেই বাংলাদেশে আসে নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা। ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে অভিনব ও অত্যন্ত নির্দয় ফর্মুলা বলেই আজ সর্বজন স্বীকৃত। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নভেল লরিয়েট ড. ইউনুস, ড. কামাল, একটি থিংক ট্যাংক ও দুটি পত্রিকা। ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল খালেদা জিয়ার দল বিএনপি। এর সুবিধা ভোগ করেছে সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার। আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ তথাকথিত কেয়ারটেকার সরকারের হাত থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করে এখন যেভাবে দেশ চালাচ্ছে তাতে আবার প্রকট হয়ে উঠছে এরশাদের জাতীয় পার্টির ও জাসদের ভাঙন তৎপরতা।

অবশ্য এই দুটি দলের ভাঙনে আওয়ামী লীগের কোনো হাত আছে বলে মনে হয় না। এরা নিজেদের হালুয়া-রুটির ভাগাভাগি করতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের টুকরো টুকরো করছে। বাংলাদেশের সব শ্রেণির রাজনীতিবিদরাই বুঝে গেছে ‘পাওয়ার ইজ মানি’ অর্থাৎ ক্ষমতাই অর্থ। তাই যেভাবেই হোক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা চাই বা ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা আছে তাদের সাথে সমঝোতা করে কিছুটা সুবিধা নেওয়া চাই। এই সুবিধা নেওয়ার জন্যই প্রত্যেক দলের প্রত্যেক সদস্যই দল গঠন করার জন্য ছটফট করছে। কেউ কারো নেতৃত্ব মানতে চাইছে না। সব দলেই চলছে ভাঙাভাঙির প্রস্তুতি।

কয়েকদিন আগে জাতীয় পার্টিতে যে ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছিল তা অশনিসংকেতই ছিল। এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টিতে ভাঙন শুধু জাতীয় পার্টিকেই নয় বর্তমান সরকারকেও কিছুটা বেকায়দায় ফেলানোর ষড়যন্ত্র বলেই মনে হচ্ছে। জাতীয় পার্টি বর্তমানে বাংলাদেশে বিরোধী দলের ভূমিকায় আছে। আগে এখানে ছিল বিএনপি। যদি বর্তমান বিরোধী দল (জাতীয় পার্টি)-কে ভেঙে টুকরো করা যায়, তাহলে সরকারের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হবে, দেশে গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হবে, আর গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হলে কারা লাভবান হবে, মানুষ তা ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারও অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে সামাল দিচ্ছেন রাজনীতির এসব টানাপড়েন। জাতীয় পার্টির ভাঙন-সংবাদ ঠাণ্ডা হতে না হতেই আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এককালের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী জাসদের ভাঙন লড়াই। জাসদ বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারের অংশ। জাসদের অনেক বিতর্কিত ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস আছে। যাদের হাত ধরে জাসদ সৃষ্টি হয়েছে এবং বর্তমানে যারা জাসদের ধব্জাধারী তাদের দুই একজনের চরিত্র বাদ দিলে জাসদের অন্যান্য নেতাদের চারিত্রিক ত্রুটির কথা এদেশের সকলেই কমবেশি জানেন।

জাসদ বাংলাদেশের এমন একটি রাজনৈতিক দল যারা স্বার্থের জন্য সবকিছু করতে পারে। এই জাসদই রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। পাটের গুদামে আগুন লাগিয়েছিল এবং ঈদের জামাতে সাংসদদের গুলি করে হত্যা করে দেশে অনেক অঘটন ঘটিয়েছিল। কোনো একটি মহল বুঝেছিল যে জাসদের পূর্ব ইতিহাস যেহেতু ক্রয়-বিক্রয়ের ইতিহাস সুতরাং এদের সহজেই পকেটে ভরা যাবে। তাই জাসদকে ভাঙার জন্য শুরু হয় তৎপরতা। কাকে ‘মশাল মার্কা’ দেওয়া হবে এ নিয়েও চলে দেন-দরকার। এখনো ‘মশাল মার্কা’ বিতর্ক শেষ হয়নি। জানি না ‘মশাল’ শেষ পর্যন্ত জাসদের কোন নেতার ভাগ্যে গিয়ে পড়বে। সত্যি কথা বলতে কি ‘মশাল মার্কা’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ মোটেই গুরুত্ব বহন করে না। মশালের কত শতাংশ ভোট আছে তাও গবেষণার বিষয়। যেহেতু ‘মশাল’ ছাড়া জাসদের ভাগাভাগির আর কিছু নেই, তাই ঝগড়ার সূচনা ‘মশাল’ নিয়েই। মশাল মার্কা যাকেই দেওয়া হোক না কেন মশাল মার্কা কাউকে পাশ-ফেল করাতে পারবে না, পাশ বা ফেল হবে জাসদ প্রার্থীর নিজ যোগ্যতা ও তারা কোন দলের সঙ্গে জোটভুক্ত তার ভিত্তিতেই।

বাংলাদেশে একমাত্র নৌকা আর ধানের শীষ প্রতীক ছাড়া আর কোনো প্রতীকের পক্ষে সম্ভব নয় মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করা। তবে ধানের শীষও এখন তার মনোনীত প্রার্থী জয়ী করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। যেহেতু তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করে না ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ, তাই বাংলার মানুষ বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে। সুতরাং মশাল বিতর্ক কেন ও কি কারণে তা বুঝতে আজ আর কারো বাকি নেই। জাসদের নীতি-নির্ধারকদের আমি শুধু এই অনুরোধই করবো, দলীয় কোন্দলে না জড়িয়ে, বর্তমান সরকারের সঙ্গে যেভাবে কাজ করে দেশ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেভাবেই কাজ করাই তাদের মঙ্গলজনক।

দেশে যখন সুস্থ রাজনীতির ধারা বিরাজ করে তখন কিছু কিছু সুবিধাবাদী মানুষ সুবিধা না পেয়ে একটা হট্টগোল লাগাবার চেষ্টা করে। এই হট্টগোলকারীরা দেশীয় হতে পারে, আবার বিদেশীও হতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করতে দেশি-বিদেশি দুই ধরনের চক্রান্তই বিদ্যমান রয়েছে। এসব চক্রান্তে পা দিলেই আমরা হারিয়ে যাবো জীবনঘাতী চোরাবালিতে। কিছুতেই এসব চক্রান্ত ও নীল নকশাকারীদের প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, যদি এদেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল দেশপ্রেমিক হতো ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করতো, তাহলে আমাদের উন্নয়নের গতি হতো অপ্রতিরোধ্য। তাই আমি এদেশের রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের বলব, বিভেদ সৃষ্টি করে নয়, পারস্পরিক সংহতি ও ঐক্য গড়ে দেশ ও দলকে এগিয়ে নিন। আইনস্টাইনের E=mc2  আণবিক শক্তির বেলায় সত্য বটে, রাজনীতির বেলায় মোটেই সত্য নয়। বাংলাদেশে যে দল যতবেশি টুকরো হয়েছে, তারাই শক্তিহীন হয়েছে। এ কথা সিপিবি, ন্যাপ ও জাসদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বটে। এক সময় তারা হারিয়েও গেছে। এটাই ইতিহাসের বাস্তবতা। ইতিহাসের এই বাস্তবতা অস্বীকার করতে চাওয়া মানে সত্যকেই অস্বীকার করা।

-মোনায়েম সরকার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৬

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।