|

নাফিসের ত্রিশ বছর কারাদন্ড

কাজী নাফিস

কাজী নাফিস

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত নাফিসকে ত্রিশ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টার অভিযোগে আটক বাংলাদেশি যুবক কাজী নাফিসকে দোষী ঘোষণা করে এ রায় প্রদান করে আদালত।

ফেডারেল চীফ জাস্টিস ক্যারল এ্যামন গত শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১১ টা ১০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ১০ মিনিট) এই রায় ঘোষণা করেন। আদালত বলেছে, আমেরিকায় সাজা খাটার পর নাফিসকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পর নাফিস যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন তাকে মার্কিন ও বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে কাটাতে হবে।
রায় ঘোষণার ঠিক আগে একটি চিঠিতে নাফিস বিচারককে জানান, ছোটবেলার তোতলামির সমস্যা, লেখাপড়ায় ভাল করতে না পারা, ভাগ্যান্বেষণে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও সফল হতে না পারা এবং মনের মানুষের বিশ্বাসভঙ্গের হতাশাই তাকে জঙ্গিবাদের পথে ঠেলে দিয়েছিল। যদিও নিজে কখনো ইসলামী জঙ্গিবাদে বিশ্বাস করেননি বলে বলে দাবি করেছেন নাফিস।
নিউ ইয়র্কে ফেডারেল কোর্টের বিচারক ক্যারল আমনকে গত ৩১ জুলাই নাফিসের পাঠানো ওই চিঠির একটি অনুলিপি বৃহস্পতিবার প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্ক ডেইলি নিউজ।
চিঠিতে নাফিস লিখেছেন-‘প্রেমিকার প্রতারণায় আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে আমার জন্য আর কোনো জায়গা নেই। বেঁচে থাকারও আর কোনো অর্থ নেই।‘ এই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা করতে পারতেন, কিন্তু ইসলামে নিষিদ্ধ বলে করেননি বলে চিঠিতে জানিয়েছেন এই বাংলাদেশি যুবক। কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে বিচারকের অনুকম্পা চান তিনি। কিন্তু তার সে আর্জিতে বিচারকের কোনো সাড়া মেলেনি।
উল্লেখ্য, স্টুডেন্ট ভিসায় গত বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর দক্ষিণ-পূর্ব মিসৌরির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন নাফিস। কিন্তু সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে ওই কোর্স শেষ না করেই জুনের শেষ সপ্তাহে নিউইয়র্কে একটি টেকনিক্যাল কলেজে ভর্তি হন।
নাফিসের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, এই বাংলাদেশি যুবক এক হাজার পাউন্ড বিস্ফোরক দিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার ভ্যানে ‘সত্যিকারের বিস্ফোরক’ না থাকায় সেটি আর ফাটেনি। গত ১৫ নভেম্বর গ্র্যান্ড জুরি নাফিসের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাদের দেয়া অভিযোগপত্র অনুমোদন করে। এতে ‘ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্যে বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা’ এবং ‘একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা করার চেষ্টার’ অভিযোগ আনা হয়। এর ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি নাফিস আদালতে দোষ স্বীকার করে বলেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত তিনি তছনছ করে দিতে চেয়েছিলেন। আর এ লক্ষ্যেই তিনি বিস্ফোরকভর্তি ভ্যানের সাহায্যে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন। শিক্ষা ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগেই তিনি ওসামা বিন লাদেনের অনুসারী হন এবং সন্ত্রাসী হামলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, জিহাদের নামে মানুষ হত্যা করা উচিত নয়।
বিচারক তখন নাফিসকে বলেন, এই অপরাধে তার ৩০ বছরের জেল এবং আড়াই লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই কোটি টাকা) জরিমানা হতে পারে। জেল খাটার সময় প্যারোলে মুক্তিরও সম্ভাবনা নেই। এমনকি একবার দোষ স্বীকার করলে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলেরও কোন সুযোগ তিনি পাবেন না।
সব শুনেও নাফিস স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেন, তিনি বুঝেই দোষ স্বীকার করছেন। যদিও পরবর্তীতে নাফিস বিচারককে লেখা তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, “আমি বিরাট ভুল করেছি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার বাবা আমার কারণে চাকরি হারিয়েছেন। একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, আমি ছাড়া আমার বাবা-মাকে দেখার এখন আর কেউ নেই। আমি তাদের পাশে থাকতে চাই।”

“আমি আপনার মাধ্যমে সবার কাছে ক্ষমা চাইছি। দয়া করে সাজা দেয়ার আগে আমাকে একটু করুণা করুন। আমার বেঁচে থাকার আশাটি জাগিয়ে রাখুন। আমাকে ক্ষমা করে দিন, প্লিজ।”

বর্তমানে নাফিসের বয়স ২১।

গত বছরের জানুয়ারি মাসে ছাত্র ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কাজি নাফিসকে গত অক্টোবর মাসে এক স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এফবিআই। তার বিরুদ্ধে বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা এবং আল কায়েদার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়। অপরদিকে, ঢাকায় কাজি নাফিসের পরিবার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নাফিস ষড়যন্ত্রের স্বীকার বলে দাবি করেছে।

-ডেস্ক রিপোর্ট

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন





টুইটারে আমরা

পূর্বের সংখ্যা