ঘরের শোভা বনসাই….

Filed under: ফিচার,সময়ের লাইফস্টাইল |

Bonsai1

 

বনসাইয়ের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সবুজে ঘেরা এক অন্যরকম অনুভূতি ও নান্দানিক সৌন্দর্যের কথা। যে সৌন্দর্য আমাদের কখনো মোহিত করে তোলে কখনো নিয়ে যায় অরন্যের স্বর্গভূমিতে। প্রাণের স্পন্দন আর শিল্পকর্মের নান্দনিকতা একে অপরের পরিপূরক বলে বনসাই আজো জীবন্ত শিল্পকর্ম বলে পরিচিত। চারদেয়াল আর অট্টালিকার ঘেরা শহুরে জীবন যখন অসহ্য অসহোনীয় বিবর্ণ হয়ে উঠেছে তখন বলাচলে বনসাই দিতে পারে চার দেয়ালের ভিতর এক টুকরো সবুজের হাতছানি। বনসাই এর ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে সূদুর চীনে এ শিল্পের আর্বিভাব ঘটে। যা পরবর্তী কালে জাপান, ভিয়েতনাম, করিয়াসহ, বিশ্বের বহু দেশে সম্প্রসারন লাভ করে । ধীরে ধীরে বনসাই বিস্তার লাভ করে দেশ হতে দেশান্তরে , শৈল্পিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে  জায়গা করে নেয় অন্দর মহলের চৌহদ্দিতে। আমাদের দেশেও সে দিক থেকে পিছিয়ে নেই। বনসাই পিপাসুরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন বনসাইয়ের খোঁজে ও তৈরীতে নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে ব্যাস্ত।

একটি বাগান করতে গেলে প্রথমেই যে চিত্রটি আমাদের মাথায় চলে আসে তা হলো জায়গা নির্ধারণ । বনসাইয়ের বেলাতে এ ব্যাপারটি থাকলেও অন্যান্য বাগানের মতো তেমন পরিসর জায়গা প্রয়োজন পরে না । একটি বৃক্ষের সব বৈশিষ্ট অক্ষুন্ন রেখে অগভীর ছোট পাত্রে রুপ দেয়াটাই হলো বনসাইয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বনসাই তৈরিতে জায়গা নির্বাচন, গাছ নির্বাচন, গাছের শাখা প্রশাখা, শেকড় নির্বাচন, রোগ প্রতিরোধ ও বনসাইয়ের স্টাইল নির্বাচন করা জরুরী।

জায়গা নির্ধারণ

বনসাইয়ের প্রধান বৈশিষ্ট হলো এর স্বল্প পরিসর। যেহেতু আজ অনেকের বাড়িতেই জায়গার সংকুলন তাই অনেকের মনে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সবুজের সঙ্গে বসবাস করা অসুবিধায় হয়ে যায়। বলা চলে বনসাই সেক্ষেত্রে অর্শিবাদ স্বরূপ। একদিকে যেমন জয়াগা নিয়ে কোন অভিযোগের সম্ভাবনা থাকে না। তেমনিই নতুনত্ব ও নান্দনিকতার এক দারুন উদাহরন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আপনার অন্দর মহলের আনাচে কানাচে। তাই বনসাই কার পূর্বে কিছু বিষয়ের প্রতি নজর দেয়া জরুরী তাহলোঃ-

(১)  আপনি বনসাই কোথায় রাখবেন তা নির্দিষ্ট করে ফেলুন ।

(২)  ঘরের ভেতোরে রাখলে গাছের চাহিদা অনুযায়ী আলো, আদ্রতা, পাবে কিনা অনুধাবন করুন।

(৩)  রোদে এ রাখলে সেখানে কিছুটা ছায়ার ব্যবস্থা আছে কিনা দেখে নিন।

(৪)  বারান্দায় এ রাখলে গরম বা বৃষ্টিপাতের জন্য সেডের ব্যবস্থা করা যাবে কিনা খেয়াল রাখুন।

 

বনসাই এ উপযুক্ত গাছগুলো

বনসাই তৈরীতে গাছ নির্ধারণ করা জরুরী। যেসব বৃক্ষ বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্য উপযোগী একমাত্র সেগুলোই নির্বাচন করুন। প্রয়োজনে বনসাই এক্সপার্টদের সহযোগীতা নিতে পারেন। আমাদের দেশে যে সব গাছ বনসাই উপযোগী তাহলোঃ-

বট, বকুল, শিমুল, পাকুড়, তেতুল, বাবলা, পলাশ, বিলিতিবেল, ছাতিম, হিজল, জাম, নিম, বেলি, গাব, শেফালী, পেয়ারা, ডালিম, তমাল, জাম্বুরা, কমলা, তুলশী, বহেরা, বরই, কামিনী, মেহেদী, কড়ই, অর্জুন, জারুল, করমচা, কদবেল, দেবদারু, হরিতকি, সাইকেশ, কামরাঙ্গা, আমলকি, কৃষ্ণচূড়া, জবা, অশ্বঘবট, নুডাবট, পাশুরবই, কাঠালবট, রঙ্গন,  লাল গোলাপ, কনকচাপা, পাথরকুচি, বাগান বিলাস, চালতাবাহার, লাল জামরুল, আলমন্ডা, তেতুল, ইত্যাদি থেকে বনসাই করা যেতে পারে।

আর যে গাছটির বনসাই তৈরি করবেন সেটার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ভালভাবে জেনে নিন। নির্বাচিত গাছের বিচি অথবা নার্সারী থেকে চার সংগ্রহ করা যেতে পারে।

বনসাই

পাত্র নির্বাচন

বনসাইয়ের আকার আকৃতি অনুযায়ী পাত্র নির্বাচন করুন । বনসাইয়ের টব বা পাত্র হতে হবে পরিষ্কার ও নিখূঁত । বনসাইয়ের পাত্রটি মানানসই হওয়া বাঞ্চনীয়। পাত্রটিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বনসাইয়ের ষ্টাইল

বনসাই তৈরি করার পূর্বে এর ষ্টাইল নির্ধারণ করে নিন। বনসাইয়ের ষ্টাইল নান ধরনের হয় তবে মুলত পাঁচটি ষ্টাইল পরিলক্ষিত হয়।

(১)  ফরমাল অপরাইঃ এই রীতির গাছগুলো চারদিকে সমানভাবে ডালপালা ছড়িয়ে উপরে উঠতে পারে।

(২)  ইনফরমাল অপরাইঃ এই রীতির গাছগুলোও উপর দিকে উঠতে পারে তবে সাধারনের মতো অত বিন্যাস্ত নয় এবং গোছানো হয় না।

(৩)  কাসকেডঃ কাসকেড রীতির গাছগুলো টবের সীমানা ছাড়িয়ে অনেকটা ঝরনার মতো গড়িয়ে নামে । সেমিকাসডেক বা অর্ধকাসডে রীতির গাছগুলো অবশ্য টবের প্রতি সীমানায় এসে আটকে যায়। বলা ভাল যে, কাসডেও ও সেমিকাসকেডের জন্য উঁচু টব ব্যবহার করতে হবে।

(৪)  স্পানিং-যে রীতির বনসাইয়ের গাছটি হেলে থাকে সেটা হলো স্পাটিং ।

(৫)  রুট ওভাররক- পাথরের উপর যে বনসাই লাগানো হয় সেটা রুট ওভারক বনসাই বলে পরিচিত। এ পদ্ধতি ষ্টাইল হলো পাথরের উপর বৃক্ষমূলের সুন্দর প্রকাশ।

এছাড়া টুইন ট্রংক, ট্রপল ট্রাংক, মাল্টি ট্রাংক করেছি। ডেপ্টউড, ল্যান্ডস্ক্যাপ, প্লাটিং লিটারোটি ইত্যাদি ষ্টাইল।

বনসাইয়ের শেপ

বনসাই তৈরিতে যেমন ষ্টাইল নির্ধারণ একটি বিষয়। তেমনি ভাবে এটার শেপ বা আকৃতি কেমন হবে তা চিন্তা করারও প্রয়োজন আছে। বিভিন্ন প্রজাতির বনসাইকে মূলত তিনটি শেপ দেয়া হয়ে থাকে। ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত স্মলশেপ, ১০-২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত  মিডিয়াম শেপ এবং ২৫-৪৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লার্জশেপ । মনে রাখবেন বনসাই যেমন নান্দনিক দর্শনীয় তেমনি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া।

bonsai-2

পাত্রে মাটি ও সার প্রয়োগ

অন্যান্য বৃক্ষের মতো বনসাই নয়। এর জন্য মাটি তৈরি করে নিতে হয়। বনসাইয়ের মাটি তৈরির ক্ষেত্রে দোআঁশ, ও পলি মাটিই উপযোগী। সে সঙ্গে মিশ্রন করতে হবে রাসয়নিক ও জৈব সার । তবে রাসয়নিক সার প্রয়োগ না করাই ভালো। রাসয়নিক সার তৈরিতে ইউরিয়া একভাগ (২০%) টি,এস,পি দুইভাগ(৪০%) এবং পটাশ দ্ইুভাগ (৪০%) মিশিয়ে এর থেকে চা চামুচের ২ চামুচ সার মিশ্রন ২ লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছ প্রতি দেড় কাপ সার গাছের গোড়াতে মেশানো যেতে পারে। অপরদিকে জৈব সার। যা বনসাইয়ের জন্য উত্তম। জৈবসার তৈরিতে সরিষা বা তীল এর খইল ৩ ভাগ, হাড়ের গুড়া মিহি করে ১ ভাগ পরিমান পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পর্যন্ত পচাঁতে হবে। মিশ্রিত ঘনসার এর ১ কাপ লিটার পানিতে মিশিয়ে টবের পাদদেশে বড় গাছ প্রতি ২ কাপ ও ছোট গাছ প্রতি ১ কাপ করে দিতে হবে। এই সার সাধারনত ৩/৪ সপ্তাহ পরপর প্রয়োগ করা উচিত। নভেম্বর থেকে জানুয়ারী এই তিনমাস গাছে সার না দেওয়াই ভালো । তবে শীতকালে যে সকল বনসাইয়ের বৃদ্ধি ঘটে সে ক্ষেত্রে সার প্রয়োগ করতে হবে। বর্তমানে বাজারেও জৈবসার কিনতে পাওয়া যায় সেখান থেকে কিনেও জৈব সার প্রয়োগ করা যেতে পারে।

 

শাখা বাছাই, শাখা ছাটাই

বনসাইকে যে মডেল বা রূপ দেয়া হবে তা বাছাই করে নিতে হবে। জোড়া পাতার কনা থেকে কান্ডের দ’ুপাশে দুটি শাখা গজায়। বাছাই পদ্ধতিতে অনুসারে এর একটি রাখতে হবে। নিচেরটি ডান দিকে রাখলে উপরেরটি বাম দিকে রাখতে হবে।

বনসাইয়ের নান্দনিকতা ধরে রাখতে ৩-৪ বছর হলে এর পূনিংয়ের প্রয়োজন হয়। তাই বাছাই করা মোটা শাখাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটতে হবে । অন্যদিকে কান্ড হচ্ছে গাছের গঠনের অন্যতম বিষয়। গাছের প্রজাতির বৈশিষ্ট সঠিকভাবে তুলে ধরতে কান্ডের সাথে শাখা প্রশাখা এবং সমঞ্জস্যতা রাখা হয়।

তার বাধা

কান্ড ও শাখা সুন্দর সুগঠন করতে তার বাধার প্রয়োজন পড়ে। সরল শাখায় তার ব্যবহার করে বনসাইয়ের আঁকাবাকা রুপ দেখা যায়। কান্ডের জন্য মোটা তার ও শাখার জন্য সরু তার প্রয়োজন। আর এটাও মনে রাখতে হবে তার সরানোর ফলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। তার খোলার পর গাছকে তাই ছায়ায় অন্তত সপ্তাহ খানেক রাখা প্রয়োজন।

বনসাইয়ের রোগ প্রতিরোধ

বনসাই একটি দৃষ্টি নন্দন শৈল্পিককর্ম। এর একটি প্রধান ও অন্যতম দিক হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা । আর এ তাই যতটা সম্ভব বনসাইকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মোটা ডাল বা কান্ড টুথ ব্রাশ দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে । বনসাইতে সাধারনত কীটপতঙ্গের আক্রমন ও ছত্রাকের আক্রমন দেখা যায়। কীট পতঙ্গের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক পাওয়া যায় সেটা ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন- ডাব সবান, ম্যালথিয়ান প্রভৃতি। ছাত্রাকের ক্ষেত্রে ডায়াথেন এম-৪৫ রিডোমিল গোল্ড জাতীয় কিটনাশক ঔষুধ ব্যবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। পিঁপড়ার আগমন, সাদা তুলার মতো বস্তু, ছোপছোপ দাগ, ছোট পোকার আগমন প্রভৃতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিচর্যা

বনসাই শুধু তৈরি করলেই হবে না। নিয়মিত দেখাশুনা করা যতœ নেয়া সবকিছুই করতে হবে আন্তরিকতার সাথে। তাই সুন্দর সবুজ দৃষ্টি নন্দন বনসাই তৈরিতে যা খেয়াল রাখবেন তা হলো-

(১)  গাছকে নিয়মিত খাবার দিতে হবে।

(২)  অতিরিক্ত পানি ও রোদ থেকে দূরে রাখতে হবে।

(৩)  ধুলো-ময়লা মুক্ত রাখতে নিয়মিত পানি দিয়ে পাতা ও ডাল মুছে দিতে হবে।

(৪)  এমন স্থানে রাখুন যেখানে আলো বাতাস চলাচল করে। এবং মানুষের সমাগম কম।

(৫)  নির্ধারিত আকৃতি ঠিক রাখতে ডালপালা বাদে ছাটাই করুন। ছাটাইয়ের নির্ধারিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করুন।

(৬) এক বছর অন্তর টবের মাটি পরিবর্তন করুন।

(৭)  বনসাইয়ের টবে অন্য কোন গাছ/আগাছা জন্মানো মাত্র তুলে ফেলুন ।

(৮) ঔষুধ ব্যবহারের ৭ দিনের মধ্যে গাছে পানি না দেয়া ভালো।

 বনসাই কেনার সময় লক্ষ্য রাখুন

আমরা অনেকেই যাচাই না করেই বনসাই ক্রয় করি। সেটা ঠিক নয়। বনসাই নানা প্রজাতির ও দামের হয়ে থাকে। দেশের বাজারে ৫০০ থেকে ৭ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বনসাই পাওয়া যায়। নন্দনত্বাত্তিক এবং স্বস্থ্যগত গাছ মানেই ভাল বনসাই । আর ভাল মানের বনসাই কম দামে পাওয়া যায় না।

কেনার পূর্বে লক্ষ্য রাখুন

(১)  বনসাই বিক্রয় লেভেল দেখে নিশ্চিত করুন কোন ধরনের বনসাই কিনছেন।

(২)  টবের মধ্যে গাছটি যদি নড়ে তবে বুঝবেন সমস্যা আছে। জবঢ়ড়ৎঃরহম  ও শিকড়ের অবস্থা ভাল কিনা নিশ্চিত হতে হবে। গাছটি অন্তত চারমাস পূর্বে  জবঢ়ড়ৎঃরহম করা হতে হবে। টবের নিচের ছিদ্রে সরু, শিকড়ের উপস্থিতি এবং মাটির মস দেখে জবঢ়ড়ৎঃরহম এর সময় সম্পর্কে অনুমান করা যেতে পারে।

(৩)  গাছের পাতা যেন হলুদ বা শুকনা না হয়।

(৪)  টবের নিচের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে হবে।

(৫)  জলে বা গাছের বাকলে গভীর দাগের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

(৬) সুন্দর নান্দনিক বনসাইটটি বেছে নিন। কেনার সময় শিল্পী সম্পর্কে জনাটাও জরুরী ।

তাই আর দেরী না করে আজই শুরু করে দিন বনসাই তৈরির চর্চা। বনসাই আপনার গৃহে শুধু নান্দনিকতাই নিয়ে আসবে না মনেও আনবে প্রশান্তির স্নিগ্ধতা । উপরন্তু একটু চেষ্টা করলে বনসাই হতে পারে আপনার উপর্জনের এক অন্যতম মাধ্যম।

প্রয়োজন ও পরামর্শে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটি

বাড়ি নং-৭১, রোড নং-৯/এ, ধানমন্ডি,

আবাসিক এলাকা।

মোবাইলঃ ০১৭১১৩৪৮৮৪৬

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।