কোন পথে আমরা ? – অভিজিৎ রায় প্রসঙ্গ

Filed under: জাতীয়,ফিচার |

avijjit_RajibDhar_0242সৈয়দ মাহি আহমেদ: হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটি কবিতা আমার খুব ভালো লাগে , সেটি হলো “সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’’ ; আমার মনে হয় , বাংলাদেশের প্রায় সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে । কিছু লোক নষ্ট করে ফেলেছে বিজ্ঞান , ইতিহাস-ঐতিহ্য , সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মানুষকে । এই নষ্ট মানুষ , সমাজ ও সংস্কৃতি এখন জিজ্ঞাসাবিমুখ , সংশয়হীন ও প্রশ্নহীন । আর এর ফলে আমাদের পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় “মানব জীবন যদি জিজ্ঞাসাবিঝুক্ত হয় ; হয় প্রশ্নহীন তবে তো ক্রমান্বয়ে ভর করে অন্ধ আবিলতা । যুক্তি-তর্ক ব্যতিরেক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ গ্রাস করে সমাজকে । মূর্খতায়, অন্ধ আবেগে পরিচালিত হয় তাবত সামাজিক কর্মকাণ্ড ও আচরণ । জিজ্ঞাসা ছাড়া অর্থহীন জীবনযাপনের দিকে ধাবিত হয় অগণিত মানুষ । আমরা সমাজের পতনোন্মুখ পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করছি । মুক্তবুদ্ধি-মুক্তচিন্তার চর্চা রহিত হয়ে অনিশ্চত অতল নিমজ্জমান । ধর্মের নামে , জাতির নামে অধর্মীয় দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে । বাতিল ও বিগত ধ্যানধারণা পুন্রুজ্জীবনের প্রচেষ্টা ক্রিয়াশীল” ।আমাদের দেশ যেমন আয়তনে সীমিত ; ঠিক তেমনি এই দেশে প্রগতিশীল , যুক্তিবাদী ও উদারপন্থী মানুষেরাও সীমিত । এই সীমিত মানুষেরাই জ্ঞান বিলিয়ে দেন , বিজ্ঞান , যুক্তি-তর্ককে ছড়িয়ে দেন দেশের অসীম মানুষের মধ্যে । বিশিষ্ট পণ্ডিত আহমদ শরীফ মুগ্ধ হয়েছিলেন আরজ আলী মাতুব্বরের মুক্তবুদ্ধি , সৎসাহস ও উদার চিন্তা দেখে । তাঁর ভাষায় , “আরজ আলী মাতুব্বরের গ্রন্থ পড়ে আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়েছি নতুন কথা বলে নয় ; তার মুক্তবুদ্ধি , সৎসাহস ও উদার চিন্তা প্রত্যক্ষ করে”। এখানেই মনে হয় পণ্ডিত ও মূর্খদের মাঝে তফাৎ । পণ্ডিতরা মুক্তবুদ্ধি , সৎসাহস ও উদারচিন্তাকে প্রশংসা করে ; আর মূর্খরা পরাজিত করে ; পাণ্ডিত ভালোবাসে প্রশ্ন ; মূর্খ পছন্দ করে নীরবতা । জ্ঞান বৃদ্ধি পায় প্রশ্ন ও সংশয়ের মাধ্যমেই ; কারণ – সংশয় হল সকল জ্ঞানের উৎস । আর তাই , পণ্ডিতরা প্রশ্ন ও সংশয়কে ভালোবাসে ; আর মূর্খরা তা অপছন্দ করে ।

আমরা যদি পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে , সভ্যতার সবসময়েই ভিন্ন মতাবলম্বীরা বিভিন্নভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন – সক্রেটিস , আরিস্টাকাস , থেলিস , বোখারি , রুশদ , গ্যালিলিও , ব্রুনো , আইন্সটাইন , রাসেলসহ আরো অনেকে । অর্থাৎ , পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস মোটেই সভ্য নয় ; কারণ সভ্য শব্দের অর্থ হল – …… ভদ্র , শিষ্ট , সাধুজন , মার্জিত রুচি । একজন মানুষ তার চিন্তার জন্য , কথা বলার জন্য , লেখার জন্য হয়েছেন নির্যাতিত , নিপীড়িত , নির্বাসিত ও বাকরুদ্ধ – এরকম ঘটনা পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সব সভ্যতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ।

সম্প্রতি অভিজিৎ রায় খুন হয়েছেন – নৃশংসভাবে চাপাতির দ্বারা । তাঁর অপরাধ কী ছিল ? তাঁর অপরাধ ছিল – তিনি লিখতেন , তিনি তাঁর মত প্রকাশ করতেন , তিনি মুক্তবুদ্ধি , মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা করতেন , তিনি কুসংস্কার , কূপমণ্ডুকতা , অন্ধবিশ্বাস , গোঁড়ামি সমাজ থেকে দূর করতে চেয়েছিলেন । অভিজিৎ রায়কে মেরে ফেলা হল , কিন্তু তাঁকে মেরে ফেলে কী যুক্তিবাদ , মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে মেরে ফেলা যাবে ? না , আমি তা মনে করি না ; কেননা আমরা প্রতিনিয়ত যুক্তি ও বিজ্ঞানকেই গ্রহণ করি এবং তার মাধ্যমেই আমাদের জীবনযাপনকে পরিচালিত করি – হয়তবা জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে । আমরা যখন আমাদের ব্যবহারিক জীবনে কোন কাজে ব্যর্থ হই , তখন আমরা হতাশাবোধ করি ; কিন্তু আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাদেরকে বলেন যে , যা হবার হয়ে গেছে , হতাশ হইও না , পরবর্তী কিছুর জন্য চেষ্টা কর , এখন থেকে কাজে লেগে যাও , এখন থেকে কাজে লেগে যাও , হতাশ হয়ে পড়ে থাকার কোন মানে হয় না , যা হয়ে গেছে বা ঘটে গেছে তা তুমি পরিবর্তন করতে পারবে না , ইত্যাদি , ইত্যাদি – আর এরকম দৃষ্টিভঙ্গিকে বলে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদ ; কারণ এখানে আমরা পরিস্থিতি বিবেচনা করে আবেগ , অনুভূতি ইত্যাদিকে বাদ দিয়ে চেষ্টা করি যুক্তি , পূর্ব-সাক্ষ্য , পূর্ব-অভিজ্ঞতা ইত্যাদির মাধ্যমেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে । আমরা কেন এরকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করি ? তার কারণ এই যে , আমরা আমাদের পূর্ব-অভিজ্ঞতা , পরীক্ষা , প্রমাণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জেনেছি যে , অতীত নিয়ে পড়ে থাকার কোনো অর্থ হয় না , শত চেষ্টা করলে অতীত আবার ফিরে আসবে না , যা হয়ে গেছে তাকে আর কোনভাবেই কোনকিছুর দ্বারা পরিবর্তন করা যাবে না ; আর এসব কারণেই আমরা এরকম দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেই । – আর এটাই সহজ কথায় যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদের মূল বিষয় । কাজেই , আমরা অনেক সময় বোঝে না-বোঝে , জেনে না-জেনে , সচেতন বা অচেতনে যুক্তি ও বিজ্ঞানকে কাজে লাগাই । “যুক্তিবাদ এক কথায় এমন একটি জীবনাদর্শ বা ব্যক্তিগত দর্শন যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে , যেখানে প্রযোজ্য সেখানে যুক্তি ও সাক্ষ্যই প্রাধান্য পায় । ‘যুক্তিবাদ কেবল যুক্তি , প্রমাণ ও সুবিচার চিন্তার দ্বারাই সত্যতা যাচাই ও বাস্তব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়’ – এই পথকে স্বীকৃতি দেয়’’। আমরা আমাদের জীবনের বেশিরভাগ কাজের ক্ষেত্রে এরকম হাজারো যুক্তি , প্রমাণ , তথ্য , সাক্ষ্য ইত্যাদি ব্যবহার করছি । যেমন – চাকুরী পাবার জন্য আমরা আবেদনপত্র , সনদপত্র , প্রশংসাপত্র পেশ করে থাকি । কেউ যদি কারোও লেখায় , সংস্কৃতিতে বা জীবনাচরণে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয় তাহলে অসুবিধা কোথায় ? বরং অনেকেই মনে করেন , বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেকোন কাজ অধিক সঠিকভাবে করা যায় ।

পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকেই জ্ঞানী-গুণীদেরকে খুব কম মানুষই ভালো চোখে দেখতেন । যেহেতু আমাদের ইতিহাসও পৃথিবীর ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত , তাই এখানের ইতিহাসও অভিন্ন । এই বাংলায় বেগম রোকেয়া , সুফিয়া কামাল , আহমদ শরীফ , কবীর চৌধুরী , সরদার ফজলুল করীম , অধ্যাপক ইউনুস , হুমায়ুন আজাদসহ অনেক জ্ঞানী-গুণী , পণ্ডিত , লেখককে ভালো চোখে দেখা হয়নি । এঁদেরকে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করা হয়েছিল । আর এর সর্বশেষ ও সম্প্রতি শিকার বিজ্ঞান লেখক , ব্লগার ও মুক্তমনা মানুষ অভিজিৎ রায় ।অভিজিৎ রায় লিখতেন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তৈরির জন্য , সমাজ থেকে অন্ধবিশ্বাস , অপবিশ্বাস , কুসংস্কার , ভণ্ডামি , গোঁড়ামি দূর করার জন্য । তাঁর একটি বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে , “বিজ্ঞান , মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদের আলোকে সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তার বহুদিনের । তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন বিজ্ঞান বিষয়ে উঁচু ডিগ্রি লাভ আর বিজ্ঞানসচেতনতা সম্পূর্ণভাবে আলাদা দুটো জিনিস’’ ।

( চলবে । )

শিক্ষার্থী , সমাজবিজ্ঞান বিভাগ , শাবিপ্রবি , সিলেট ।

রেফারেন্স:

১ । আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র ( ভূমিকা লিখেছিলেন – আইয়ুব হোসেন ) ।

২ । ঐ ( আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে বিশিষ্ট কয়েকজন বাঙ্গালীর অভিমত ) ।

৩ । বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান ।

৪ । যুক্তিবাদ কী ? – অপার্থিব ( স্বতন্ত্র ভাবনা ) ।

৫ । মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে – অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ ।

সময়ের কথায় প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।